চাঁপাইনবাবগঞ্জে স্কুল ফিডিং কর্মসূচির নিম্নমানের খাবার খেয়ে ২০ শিক্ষার্থী অসুস্থ: সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘গাক’-কে জরিমানা ও কার্যক্রম স্থগিত
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পরিচালিত ‘স্কুল ফিডিং’ (School Feeding) কর্মসূচির খাবারে চরম অনিয়ম ও গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে। নিম্নমানের পাউরুটি খেয়ে ২০ জন শিক্ষার্থীর অসুস্থ হওয়ার ঘটনায় এলাকা জুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে উপজেলা প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে খাবার সরবরাহকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘গাক’ (GUK)-কে বড় অংকের জরিমানা এবং তাদের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। কোমলমতি শিশুদের স্বাস্থ্য নিয়ে এমন খামখেয়ালি কোনোভাবেই কাম্য নয় বলে মনে করছেন সচেতন অভিভাবক ও শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা।
শংকরবাটি স্কুলে অসুস্থতা ও আতঙ্ক
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত বুধবার (২২ এপ্রিল ২০২৬) দুপুরে সদর উপজেলার শংকরবাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতায় প্যাকেটজাত পাউরুটি বিতরণ করা হয়।
- উপসর্গ: খাবার গ্রহণের কিছুক্ষণ পরেই প্রায় ২০ জন শিক্ষার্থী পেটে ব্যথা ও বমির সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে পড়ে।
- তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ: দ্রুত বিষয়টি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নজরে এলে তারা অন্য শিক্ষার্থীদের ওই পাউরুটি খাওয়া থেকে বিরত রাখেন এবং অসুস্থদের প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।
- অভিভাবকদের ক্ষোভ: এই ঘটনায় অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং তারা বিদ্যালয়ের সামনে এসে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয় এবং অসুস্থ শিক্ষার্থীদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়।
ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান ও দণ্ড প্রদান
শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হওয়ার খবরটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাহিদ ইসলাম রাজনের নেতৃত্বে গত বুধবার রাতেই একটি জরুরি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হয়।
অভিযানের প্রধান সিদ্ধান্ত ও দণ্ডসমূহ নিচে দেওয়া হলো:
- প্রমাণ জব্দ: খাদ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘গাক’-এর স্থানীয় গুদামে অভিযান চালিয়ে অস্বাস্থ্যকর ও নিম্নমানের খাদ্যসামগ্রীর উপস্থিতির স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়।
- আর্থিক জরিমানা: ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে প্রতিষ্ঠানটিকে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে এবং অনাদায়ে এক মাসের বিনাশ্রম কারাভোগের আদেশ দেওয়া হয়।
- কার্যক্রম স্থগিত: একই সাথে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সদর উপজেলার ২১৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে উক্ত এনজিও বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে খাবার সরবরাহ কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি ও তদারকির অভাব
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মাহমুদুজ্জামান জানিয়েছেন যে, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে যথাযথ মান নিয়ন্ত্রণের পর খাবার সরবরাহের কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ‘গাক’ কর্তৃপক্ষ সেই নির্দেশনা অমান্য করে মুনাফার লোভে নিম্নমানের ও অস্বাস্থ্যকর পাউরুটি সরবরাহ করেছে।
| আক্রান্ত বিদ্যালয় | সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান | দণ্ড ও প্রশাসনিক অ্যাকশন | মোট স্থগিত স্কুল |
| শংকরবাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় | গাক (GUK) | ৪০,০০০ টাকা জরিমানা ও গুদাম সিলগালা | ২১৩টি বিদ্যালয় |
মাঠ পর্যায়ের তদারকির অভাব এবং বেসরকারি সংস্থাগুলোর খামখেয়ালিপনার কারণে শিশুদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ায় অভিভাবকরা দাবি তুলেছেন যে, কেবল জরিমানা নয়, বরং এমন প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স চিরতরে বাতিল করে তাদের কালো তালিকাভুক্ত (Blacklisted) করা উচিত।
পুষ্টি কর্মসূচি সুরক্ষায় ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত এই বিশাল কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য ছিল শিশুদের অপুষ্টি দূর করা এবং তাদের স্কুলমুখী করা। কিন্তু নিম্নমানের খাবারের খবর ছড়িয়ে পড়লে অভিভাবকরা সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে দ্বিধাবোধ করতে পারেন—যা প্রাথমিক শিক্ষার জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ।
এই সংকট কাটাতে এবং স্কুল ফিডিং প্রোগ্রামে শতভাগ স্বচ্ছতা আনতে শিক্ষা প্রশাসনের সরাসরি তত্ত্বাবধানে বিশেষ অডিট টিম গঠন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এখন থেকে প্রতিটি স্কুলে খাবার বিতরণের আগে তা স্থানীয়ভাবে মান যাচাইয়ের জন্য বিশেষ কমিটির অনুমোদন বাধ্যতামূলক করার কথা ভাবা হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে দেশের কোথাও এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
FAQ – সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী
প্রশ্ন ১: চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার স্থগিত হওয়া ২১৩টি স্কুলে বিকল্প উপায়ে খাবার সরবরাহের কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কি?
উত্তর: সাময়িকভাবে কার্যক্রম স্থগিত থাকায় উক্ত স্কুলগুলোতে বিকল্প কোনো মানসম্মত এজেন্সির মাধ্যমে বা সরকারি ব্যবস্থাপনায় নিরাপদ পুষ্টিকর খাবার চালুর বিষয়ে উপজেলা শিক্ষা অফিস ও জেলা প্রশাসন দ্রুতই নতুন নির্দেশনা জারি করবে।
প্রশ্ন ২: সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত ব্যবস্থা বা লাইসেন্স বাতিলের আপডেট কোথায় জানা যাবে?
উত্তর: তদন্ত কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন এবং সরবরাহকারী এনজিওর বিরুদ্ধে গৃহীত পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের তথ্য প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের (DPE) (অফিসিয়াল ওয়েবসাইট) এ নোটিশ আকারে প্রকাশ করা হবে।
উপসংহার ও শেষ কথা
চাঁপাইনবাবগঞ্জের এই ঘটনাটি দেশের সামগ্রিক শিক্ষা প্রশাসনের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। তবে স্থানীয় প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপ ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের তাৎক্ষণিক অভিযান প্রমাণ করে যে, শিশুদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টির বিষয়ে কোনো প্রকার অনিয়ম বরদাশত করা হবে না।
আমরা আশা করি, অসুস্থ শিক্ষার্থীরা দ্রুত সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠবে এবং পুনরায় আনন্দময় ও নিরাপদ পরিবেশে ক্লাসে ফিরে আসবে। স্কুল ফিডিং, শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষা প্রশাসনের সকল ব্রেকিং নিউজ ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট সবার আগে পেতে আমাদের ওয়েবসাইটের সাথেই থাকুন।

