মানিকগঞ্জের হরিরামপুরে অস্তিত্বহীন বিদ্যালয়ের নামে ২৭ লাখ টাকা আত্মসাৎ: সাবেক ভাইস চেয়ারম্যানসহ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে তোলপাড়
গ্রাম বাংলার সাধারণ মানুষ যখন সন্তানদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য স্কুল তৈরির স্বপ্ন দেখে, তখন কিছু অসাধু মহল সেই স্বপ্নকে পুঁজি করে তোলে লাখ লাখ টাকা আত্মসাতের মেশিন। মানুষের বিশ্বাস আর সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে তৈরি হয় দুর্নীতির সিন্ডিকেট, তার একটি চাঞ্চল্যকর উদাহরণ তৈরি হয়েছে মানিকগঞ্জের হরিরামপুরে।
সেখানে ‘বিদ্যালয়’ বলে কোনো জমি-জমা বা কাঠামো নেই, অথচ সেই বিদ্যালয়ের নামেই সরকারি বরাদ্দের ২৭ লাখ টাকা লোপাটের অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দায়ের করা লিখিত অভিযোগ ইতিমধ্যে জেলা শিক্ষা অফিসে তীব্র তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।
অস্তিত্বহীন বিদ্যালয় ও টাকা আত্মসাতের ফাঁদ
সবকিছুর শুরু হয় হরিরামপুর উপজেলার ছয়আনীগালা প্রাথমিক বিদ্যালয় নামের এক অদ্ভুত প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে। এলাকাবাসীর লিখিত অভিযোগ অনুযায়ী, স্থানটিতে নামমাত্র একটি বিদ্যালয়ের সাইনবোর্ড ছাড়া আর কিছুই নেই। বিদ্যালয়ের নামে কোনো নিজস্ব জমি নেই, নেই কোনো অবকাঠামো।
তথাপি, ভুয়া তথ্য ও কাগজপত্র সাজিয়ে স্থানীয় এক প্রভাবশালী চক্র সরকারি উন্নয়ন বরাদ্দের টাকা বাগিয়ে নেয়। এই প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২৭ লাখ টাকা বরাদ্দ আসে, যা নিখুঁত পরিকল্পনার মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া হয়। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, টাকা আত্মসাতের এই মহাপরিকল্পনার মূল নায়ক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন দুইজন ব্যক্তি:
- মো. আবুল বাশার সবুজ: হরিরামপুর উপজেলার সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান।
- এ বি এম শামসুন নবী (তুলিপ): এই চক্রের অন্যতম প্রধান সহযোগী ও পরিকল্পনাকারী।
জমি নেই, কাজও ভুয়া: কীভাবে চলছিল জালিয়াতি?
একটি বিদ্যালয় নির্মাণ করতে গেলে প্রথম প্রয়োজন নিজস্ব জমি। কিন্তু এখানে সেই মৌলিক শর্তটাই পূরণ হয়নি। অভিযোগে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ছয়আনীগালা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নিজস্ব কোনো জমি নেই।
প্রকল্পের অর্থ লোপাটের কৌশলগুলো ছিল নিম্নরূপ:
- ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি ব্যবহার: চক্রের সদস্যরা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ব্যক্তিমালিকানাধীন একটি খালি জমি বেছে নেন, যা মূলত স্থানীয় শিশুদের খেলার মাঠ হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
- কাগজে-কলমে মাটি ভরাট: সেই জমিতে ‘মাটি ভরাটের ভুয়া কাজ’ দেখিয়ে, কাগজে-কলমে প্রকল্পের অগ্রগতি নিশ্চিত করা হয়।
- বাস্তবে শূন্য অগ্রগতি: বাস্তবে সেই জমিতে কোনো ধরনের মাটি ভরাট বা অবকাঠামোগত কাজই করা হয়নি। পুরো টাকাটাই সরাসরি চলে যায় সিন্ডিকেটের পকেটে।
শামসুন নবীর সম্পদের ‘আলাদিনের চেরাগ’ কাহিনি
অভিযোগপত্রে এ বি এম শামসুন নবীর হঠাৎ আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। মাত্র কয়েক বছর আগেও যিনি ভাড়া বাসায় থাকতেন, তিনি বর্তমানে হরিরামপুর ও মানিকগঞ্জ শহরে দুটি পাঁচতলা বাড়ির মালিক। তার পাশাপাশি ঢাকা ও সাভারে রয়েছে একাধিক ফ্ল্যাট ও বেশ কয়েকটি জমি।
স্থানীয়দের দাবি, বিগত সরকারের আমলে প্রভাবশালী নেতাদের ছত্রছায়ায় এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে এই সম্পদের পাহাড় গড়েছেন শামসুন নবী। বিশুদ্ধ পানি প্রকল্পের কাজ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করে তিনি কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
দুর্নীতির খতিয়ান ও স্থানীয়দের দাবি
এই ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর পুরো জেলা জুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ মানুষ যেখানে ভেবেছিলেন তাদের সন্তানদের জন্য একটি স্কুল হবে, সেখানে উল্টো সরকারি টাকা লোপাটের ঘটনা তাদের স্তব্ধ করে দিয়েছে। ভুক্তভোগী এলাকাবাসী এখন জেলা শিক্ষা প্রশাসনের কাছে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
| অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান/প্রকল্প | আত্মসাৎকৃত অর্থ | প্রধান অভিযুক্ত ব্যক্তিগণ | এলাকাবাসীর মূল দাবি |
| ছয়আনীগালা প্রাথমিক বিদ্যালয় | ২৭,০০,০০০ টাকা | মো. আবুল বাশার সবুজ ও এ বি এম শামসুন নবী | ১. অর্থ সরকারি তহবিলে ফেরত আনা। ২. জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। ৩. দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা। |
FAQ – সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী
প্রশ্ন ১: অস্তিত্বহীন ছয়আনীগালা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই দুর্নীতির তদন্তের বর্তমান অবস্থা কী?
উত্তর: এলাকাবাসীর লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে জেলা শিক্ষা অফিস ইতিমধ্যে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তদন্তের অগ্রগতি এবং অফিশিয়াল নোটিশ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের (অফিসিয়াল ওয়েবসাইট) এ প্রকাশ করা হবে।
প্রশ্ন ২: সরকারি বরাদ্দের আগে জমি বা অবকাঠামো যাচাইয়ের নিয়ম কী ছিল?
উত্তর: নিয়ম অনুযায়ী স্থানীয় শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর বা মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ভৌত অবকাঠামো যাচাই করার কথা থাকলেও, এই ক্ষেত্রে প্রশাসনিক শিথিলতা বা যোগসাজশ ছিল কি না তা খতিয়ে দেখছে তদন্ত দল।
উপসংহার ও শেষ কথা
বিদ্যালয়ের নামে এভাবে সরকারি টাকা আত্মসাতের ঘটনা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঙ্গে মারাত্মক প্রতারণা ছাড়া কিছু নয়। মানিকগঞ্জের এই উদাহরণ প্রমাণ করে যে, উপজেলা পর্যায়ে সরকারি প্রকল্পের অর্থ লোপাটের জন্য একটি পদ্ধতিগত অনিয়ম শিকড় গেড়ে বসেছে।
জেলা শিক্ষা অফিস ও জেলা প্রশাসনের উচিত দ্রুত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা। একইসঙ্গে, সরকারি বরাদ্দের টাকা ছাড় করার আগে বিদ্যালয়ের জমি ও অবকাঠামোর সত্যতা যাচাই করার কঠোর প্রক্রিয়া চালু করতে হবে। দোষীদের শাস্তি ও টাকা উদ্ধার করতে পারলেই কেবল এই ধরণের জঘন্য অনিয়মের পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব হবে।

