একই কর্মস্থলে ১ দশক! শিবালয়ের একাডেমিক সুপারভাইজারের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেট ও অনিয়মের পাহাড়, ক্ষুব্ধ শিক্ষকরা

মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলায় কর্মরত একাডেমিক সুপারভাইজারের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সময় একই কর্মস্থলে অবস্থান এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে নানা অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘ প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় (১০ বছর) ধরে একই স্থানে কর্মরত থাকায় তিনি একটি শক্তিশালী অনৈতিক সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন বলে স্থানীয় শিক্ষক ও সচেতন মহলের দাবি। এই দীর্ঘ অবস্থানের সুযোগে তিনি শিক্ষা ব্যবস্থার মাঠ পর্যায়ের তদারকি করার পরিবর্তে ব্যক্তিগত আখের গুছিয়ে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।


একই স্টেশনে বছরের পর বছর: চেইন অব কমান্ড ভাঙার উপক্রম

অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তদারকি, শিক্ষকদের এমপিওভুক্তি (MPO) এবং একাডেমিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার আইনি দায়িত্ব থাকলেও ওই সুপারভাইজার নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করছেন না।

কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা মূল অভিযোগগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

  • অবৈধ আর্থিক সুবিধা: বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মিত অবৈধ আর্থিক সুবিধা গ্রহণ এবং পছন্দের শিক্ষকদের অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
  • প্রশাসনিক নজরদারি এড়ানো: একই স্থানে দীর্ঘদিন থাকার সুবাদে তিনি স্থানীয় কিছু প্রভাবশালীদের সাথে গভীর যোগসাজশ গড়ে তুলেছেন, যার ফলে সহজেই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক নজরদারি এড়িয়ে চলছেন।
  • হয়রানির ভয়: সাধারণ শিক্ষকরা তাঁর নানামুখী হয়রানি ও ফাইল আটকে রাখার ভয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পান না।

একজন কর্মকর্তার একই স্টেশনে বছরের পর বছর থাকা সরকারি চাকরি বিধিমালার সম্পূর্ণ পরিপন্থী হলেও কেন তাঁকে এতদিন বদলি করা হচ্ছে না, তা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগীরা। এই অনিয়মের কারণে উপজেলার মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা স্তরের প্রশাসনিক ‘চেইন অব কমান্ড’ (Chain of Command) ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।


ফাইল আটকে ঘুষ দাবি ও কেনাকাটায় অনৈতিক হস্তক্ষেপ

শিবালয়ের এই একাডেমিক সুপারভাইজারের বিরুদ্ধে ওঠা প্রধান অভিযোগগুলোর ধরণ অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও ক্ষোভের জন্ম দেওয়ার মতো:

১. অনিয়ম ধামাচাপা দেওয়া

নিয়মিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে গিয়ে বিভিন্ন অনিয়ম বা ঘাটতি ধরা পড়লেও মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের বিনিময়ে সেগুলোকে গোপন রিপোর্টের মাধ্যমে ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

২. নতুন শিক্ষকদের ইনডেক্স ও বেতন ছাড়ে বাধা

সবচেয়ে জঘন্য অভিযোগটি হলো, নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের ইনডেক্স নম্বর এবং বেতন ছাড়ের ফাইলে স্বাক্ষর বা সুপারিশ করার জন্য তিনি শিক্ষকদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা দাবি করেন। এর ফলে যোগ্য, সৎ ও নতুন শিক্ষকরা কর্মজীবনের শুরুতেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছেন।

৩. ল্যাব ও লাইব্রেরি সরঞ্জাম কেনাকাটায় সিন্ডিকেট

স্থানীয় শিক্ষকদের মতে, একাডেমিক সুপারভাইজার কেবল নথিপত্র বা ফাইলেই সীমাবদ্ধ নন, বরং স্কুলের ল্যাবরেটরি ও লাইব্রেরির সরঞ্জাম কেনাকাটার ক্ষেত্রেও সরাসরি হস্তক্ষেপ করেন। নির্দিষ্ট কিছু ভেন্ডর বা কালো তালিকাভুক্ত ঠিকাদারকে কাজ দেওয়ার জন্য তিনি প্রতিষ্ঠান প্রধানদের (প্রধান শিক্ষক ও অধ্যক্ষ) ওপর অনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেন। এর ফলে শিক্ষা উপকরণের গুণগত মান বজায় থাকছে না এবং সরকারের বরাদ্দকৃত অর্থের সঠিক ব্যবহার হচ্ছে না। এ সংক্রান্ত কর্মকর্তাদের বদলি ও আচরণ বিধিমালা দেখতে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (DSHE) (অফিসিয়াল ওয়েবসাইট) ভিজিট করতে পারেন।


‘দুদক’ ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি প্রদানের প্রস্তুতি

শিক্ষা প্রশাসনের নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পর পর মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক বদলি হওয়ার কথা থাকলেও শিবালয়ের এই কর্মকর্তার ক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে। এই দীর্ঘমেয়াদী অবস্থান তাকে এক ধরণের জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে নিয়ে গেছে। প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের নিয়মিত তদারকি না থাকায় তিনি নিজের ইচ্ছেমতো অফিস পরিচালনা করছেন, যা ওই এলাকার শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দ্রুত তদন্তের দাবি: শিবালয়ের এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের যথাযথ তদন্তের দাবি জানিয়েছে স্থানীয় শিক্ষক সমাজ ও অভিভাবক ফোরাম। ইতিমধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কাছে এই বিষয়ে একটি সমন্বিত স্মারকলিপি প্রদানের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। একই সাথে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিশেষ মনিটরিং সেল যদি এই নথিপত্রগুলো খতিয়ে দেখে, তবে ভয়াবহ সব তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।


সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)

প্রশ্ন ১: একজন সরকারি কর্মকর্তার একই কর্মস্থলে সর্বোচ্চ কত বছর থাকার নিয়ম রয়েছে?

উত্তর: সরকারি চাকুরিজীবী বিধিমালা ও বদলি নীতিমালা অনুযায়ী, সাধারণত একজন কর্মকর্তা একই কর্মস্থলে বা স্টেশনে একটানা ৩ বছরের বেশি অবস্থান করতে পারেন না। প্রশাসনিক বা বিশেষ কারণ ছাড়া এর বেশি সময় থাকা নিয়মবহির্ভূত।

প্রশ্ন ২: এই ধরণের দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শিক্ষকরা কীভাবে পরিচয় গোপন রেখে অভিযোগ করতে পারেন?

উত্তর: ভুক্তভোগী শিক্ষকরা সরাসরি দুর্নীতি দমন কমিশনের (ACC) হটলাইন ‘১০৬’ নম্বরে কল করে অথবা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গ্রিভেন্স রিড্রেসাল সিস্টেমে (GRS) অনলাইনের মাধ্যমে পরিচয় গোপন রেখে সুনির্দিষ্ট প্রমাণসহ অভিযোগ দায়ের করতে পারেন।


উপসংহার ও শেষ কথা

একই কর্মস্থলে দীর্ঘ সময় অবস্থান করে অনিয়মের জাল বিস্তার করা আমাদের শিক্ষা প্রশাসনের মাঠ পর্যায়ের তদারকির দুর্বলতা ও একটি বড় কলঙ্ক। শিবালয়ের এই একাডেমিক সুপারভাইজারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো গুরুত্বের সাথে নিয়ে দ্রুত বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।

শিক্ষা খাতের প্রকৃত সংস্কার কেবল পাঠ্যবই পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্য রোধ করাই হবে শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নের প্রকৃত চাবিকাঠি। শিবালয়ের এই ঘটনাটি সারাদেশে একটি কঠোর উদাহরণ হয়ে থাকা উচিত যে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে কেউ পার পাবে না। সুশাসন নিশ্চিত করতে হলে বদলি নীতিমালার কঠোর বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপই পারে শিবালয়ের শিক্ষার সুস্থ পরিবেশ ফিরিয়ে দিতে।

শিক্ষা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *