ভর্তিতে অতিরিক্ত ফি আদায় করলে নিবন্ধন ও এমপিও বাতিল: শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘জিরো টলারেন্স’ বার্তা
দেশের বেসরকারি স্কুল ও কলেজগুলোতে শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত ফি-র চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায় বন্ধে পুনরায় কড়া ও স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। গত ১০ মে ২০২৬ (রোববার) প্রকাশিত এক জরুরি নির্দেশনায় স্পষ্ট করা হয়েছে যে, কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যদি সরকারি নীতিমালার বাইরে উন্নয়ন ফি বা অন্য কোনো অজুহাতে বাড়তি টাকা আদায় করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই কড়া বার্তার ফলে ভর্তি মৌসুমে বিপাকে পড়া দেশের লাখ লাখ সাধারণ অভিভাবকদের মনে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে।
নীতিমালা লঙ্ঘন করলেই কঠোর শাস্তির হুঁশিয়ারি
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিবিড় পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, দেশের অনেক নামী-দামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সেশন চার্জ ও ভর্তির ফির নামে সরকার নির্ধারিত সীমার চেয়ে দ্বিগুণ বা তিনগুণ অর্থ আদায় করছে। এই অনিয়ম রোধে জারি করা নির্দেশনার মূল দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
- টার্গেটে নামী প্রতিষ্ঠান: বিশেষ করে ইংরেজি ভার্সন এবং রাজধানীর নামকরা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ সবচেয়ে বেশি।
- কঠোর শাস্তির বিধান: নতুন এই নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কোনো প্রতিষ্ঠান নীতিমালা লঙ্ঘন করলে সরাসরি তাদের এমপিও (MPO) স্থগিত করা হতে পারে।
- পরিচালনা পর্ষদ বাতিল: বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বিধিভঙ্গের দায়ে পরিচালনা পর্ষদ (Governing Body) বাতিলসহ প্রতিষ্ঠানের চূড়ান্ত নিবন্ধন বাতিলের সুপারিশ করা হবে।
শিক্ষা সচিব জানিয়েছেন যে, অতিরিক্ত ফি আদায়ের অভিযোগ তদন্ত করতে প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিশেষ তদারকি টিম গঠন করা হয়েছে। যদি কোনো অভিভাবক বাড়তি টাকা দেওয়ার প্রমাণসহ অভিযোগ করেন, তবে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভর্তি নীতিমালা ও তদারকি ব্যবস্থার কঠোরতা
সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, মফস্বল, পৌরসভা ও মহানগর পর্যায়ে ভর্তির জন্য আলাদা আলাদা ফির সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া আছে। ভর্তি প্রক্রিয়া শতভাগ স্বচ্ছ রাখতে এবার বেশ কিছু নতুন নিয়ম বাধ্যতামূলক করা হয়েছে:
১. বৈধ রশিদ প্রদান বাধ্যতামূলক
অনেক সময় ‘বিবিধ’ খরচের দোহাই দিয়ে রশিদ ছাড়াই টাকা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। নতুন নির্দেশনায় স্পষ্ট করা হয়েছে যে, প্রতিটি পয়সা আদায়ের বিপরীতে বৈধ ডিজিটাল বা ম্যানুয়াল রশিদ প্রদান বাধ্যতামূলক। রশিদে উল্লিখিত ফি-র বাইরে এক টাকাও বেশি নেওয়া যাবে না এবং তা প্রতিষ্ঠানের নোটিশ বোর্ড ও ওয়েবসাইটে প্রদর্শন করতে হবে।
২. বাধ্যতামূলক কেনাকাটা নিষিদ্ধ
তদারকি টিমগুলো ইতিমধ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ঝটিকা পরিদর্শন শুরু করেছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ভর্তির সময় বাধ্যতামূলকভাবে স্কুল থেকে ইউনিফর্ম, ডায়েরি, খাতা বা বই কিনতে বাধ্য করা হয়। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এ ধরণের ‘বাধ্যতামূলক কেনাকাটা’ মূলত অতিরিক্ত ফি আদায়ের একটি কৌশলী রূপ, যা সম্পূর্ণ বেআইনি। শিক্ষার্থীদের স্বাধীনভাবে বাজার থেকে শিক্ষা উপকরণ সংগ্রহের অধিকার দিতে হবে।
অভিভাবকদের প্রতিক্রিয়া: অভিভাবক ঐক্য ফোরাম এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, কেবল কাগজ-কলমে নির্দেশ জারি করলে হবে না, এর মাঠ পর্যায়ের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। এবার শিক্ষা মন্ত্রণালয় জিরো টলারেন্স (Zero Tolerance) নীতি ঘোষণা করায় অনিয়ম অনেকাংশে কমে আসবে বলে আশা করা যাচ্ছে। ভর্তি নীতিমালার পূর্ণাঙ্গ গেজেট দেখতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের (অফিসিয়াল ওয়েবসাইট) ভিজিট করতে পারেন।
শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ রোধ ও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা
শিক্ষাকে ব্যবসার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা রোধে এই ধরণের প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি ছিল। অতিরিক্ত ফির চাপে অনেক মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবার তাদের সন্তানদের ভালো মানের স্কুলে ভর্তি করাতে হিমশিম খাচ্ছে। যখন একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কেবল মুনাফার দিকে নজর দেয়, তখন সেখানে নৈতিক শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এই কঠোর বার্তা মূলত শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ রোধে একটি শক্তিশালী পদক্ষেপ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত সরকারি অডিট করা প্রয়োজন। সরকার যদি শিক্ষার এই প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে, তবেই ঝরে পড়ার (Drop out) হার কমানো সম্ভব হবে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
প্রশ্ন ১: কোনো স্কুল অতিরিক্ত ফি দাবি করলে অভিভাবকরা কোথায় অভিযোগ জানাবেন?
উত্তর: অভিভাবকরা প্রয়োজনীয় প্রমাণ বা রশিদের কপিসহ সরাসরি জেলা শিক্ষা অফিসার (DEO), উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার অথবা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনলাইন অভিযোগ সেলে লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারবেন।
প্রশ্ন ২: সেশন চার্জ কি প্রতি বছর নতুন করে দিতে হবে?
উত্তর: সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, একই বিদ্যালয়ে এক শ্রেণি থেকে পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার ক্ষেত্রে পুনঃভর্তি বা সেশন চার্জের নামে অতিরিক্ত ফি আদায়ের সুনির্দিষ্ট আইনি নীতিমালা রয়েছে, যা কোনোভাবেই নির্ধারিত সীমার বেশি হতে পারবে না।
উপসংহার ও শেষ কথা
শিক্ষার্থী ভর্তিতে অতিরিক্ত ফি আদায়ের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ের এই কঠোর অবস্থান একটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও সময়োপযোগী উদ্যোগ। শিক্ষা কোনো বাণিজ্যিক পণ্য নয়, এটি প্রতিটি শিশুর সাংবিধানিক ও মৌলিক অধিকার। নিয়ম লঙ্ঘনকারী দু-একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে এই অশুভ সংস্কৃতি চিরতরে বন্ধ হবে।
আমরা আশা করি, প্রশাসনের কঠোর নজরদারির মাধ্যমে কোনো শিক্ষার্থী যেন কেবল অর্থের অভাবে মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়। নীতিমালার সঠিক অনুসরণই পারে একটি বৈষম্যহীন ও স্মার্ট শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে।

