পাবলিক পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের সম্মানী আটকে ‘সুদ বাণিজ্য’: শিক্ষা বোর্ড কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ!

পাবলিক পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নের পর শিক্ষকদের প্রাপ্য সম্মানী সময়মতো পরিশোধ না করে ব্যাংকে জমিয়ে রেখে সুদের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে শিক্ষা বোর্ডের কতিপয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। গত ১০ মে ২০২৬ তারিখে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসএসসি (SSC) ও এইচএসসি (HSC) পরীক্ষার খাতা দেখার সম্মানী দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে আটকে রাখা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী ফল প্রকাশের অল্প সময়ের মধ্যেই এই অর্থ শিক্ষকদের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে পাঠানোর কথা থাকলেও, আমলাতান্ত্রিক জটিলতার অজুহাতে তা দিনের পর দিন বিলম্বিত করা হচ্ছে।


সাধারণ শিক্ষকরা উপেক্ষিত, কর্মকর্তাদের পকেটে যাচ্ছে কোটি টাকা

নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে শিক্ষকদের কষ্টের টাকা আটকে রাখার এই ঘটনায় শিক্ষা মহলে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগের মূল দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

  • স্থায়ী আমানত (SDR) বাণিজ্য: অভিযোগ উঠেছে, শত শত কোটি টাকা দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাংকে এসডিআর (SDR) বা স্থায়ী আমানত হিসেবে রেখে সেখান থেকে মোটা অঙ্কের সুদ পকেটে ভরছেন সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা।
  • মানবেতর জীবনযাপন: বর্তমান দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে যেখানে সাধারণ শিক্ষকরা জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন, সেখানে তাদের হাড়ভাঙ্গা খাটুনির টাকা দিয়ে কর্মকর্তাদের এই ‘সুদ বাণিজ্য’ চলছে।
  • শিক্ষকদের ক্ষোভ: ভুক্তভোগী শিক্ষকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, “আমরা দিনরাত এক করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিখুঁতভাবে খাতা দেখি। কিন্তু নিজের নায্য পাওনা টাকা পেতে মাসের পর মাস বোর্ডের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়, যা অত্যন্ত অপমানজনক।”

ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেমে অস্বচ্ছতা ও প্রশাসনিক অজুহাত

শিক্ষা বোর্ডগুলোর অর্থ শাখা থেকে বরাবরের মতোই দাবি করা হচ্ছে যে, যান্ত্রিক ত্রুটি, ডাটা এন্ট্রিতে ভুল বা সরকারি অডিট ও ভ্যাট সংক্রান্ত জটিলতার কারণে অর্থ ছাড় করতে দেরি হচ্ছে।

তবে শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা এবং শিক্ষক সংগঠনগুলো এই একঘেয়ে অজুহাত মানতে নারাজ। তাদের মতে:

১. সুপরিকল্পিত দুর্নীতি: ডিজিটাল বাংলাদেশে যেখানে মুহূর্তের মধ্যে লাখ লাখ মানুষের কাছে উপবৃত্তি বা ভাতার অর্থ স্থানান্তর সম্ভব, সেখানে হাজার হাজার শিক্ষকের সম্মানী মাসের পর মাস আটকে থাকা কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং সুপরিকল্পিত দুর্নীতি।

2. অলীক সিন্ডিকেট: টাকা ছাড় করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ‘পার্সেন্টেজ’ বা বকশিশ দেওয়ার অলিখিত প্রথাও কোনো কোনো বোর্ডে চালু রয়েছে বলে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। এই সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে শিক্ষা প্রশাসনের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ণ হবে।

৩. দক্ষ পরীক্ষক হারানোর শঙ্কা: অনেক শিক্ষক জানিয়েছেন, বোর্ডের এই নেতিবাচক আচরণের কারণে তারা পরবর্তী পরীক্ষার খাতা দেখা থেকে বিরত থাকার কথা ভাবছেন। এর ফলে ভবিষ্যতে দক্ষ পরীক্ষক খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে, যা সামগ্রিক মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার গুণগত মান কমিয়ে দিতে পারে। শিক্ষা সংক্রান্ত যেকোনো জরুরি নীতিমালা ও নোটিশ দেখতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের (অফিসিয়াল ওয়েবসাইট) ভিজিট করতে পারেন।


শিক্ষা প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণে জরুরি সংস্কারের দাবি

শিক্ষকদের পাওনা নিয়ে এই অনিশ্চয়তা দূর করতে এবং শিক্ষা ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করছেন সচেতন অভিভাবক ও শিক্ষক সমাজ। বিশেষজ্ঞরা বেশ কিছু জরুরি সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন:

১. স্বয়ংক্রিয় ও সময়াবদ্ধ পদ্ধতি (Automated System)

পরীক্ষকদের সম্মানী প্রদানের জন্য একটি সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় এবং সময়াবদ্ধ সেন্ট্রাল ডিজিটাল পেমেন্ট পদ্ধতি চালু করা উচিত, যেখানে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী বা তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপের সুযোগ থাকবে না।

২. জবাবদিহিতা ও শাস্তি

ফলাফল প্রকাশের একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে টাকা না পাঠালে দায়ী কর্মকর্তাদের কৈফিয়ত তলব এবং শাস্তির বিধান রাখা প্রয়োজন। একই সাথে বছরের পর বছর বোর্ডে জেঁকে বসা অসাধু কর্মকর্তাদের অনতিবিলম্বে বদলি করা উচিত।

৩. মনিটরিং সেল গঠন

কেন্দ্রীয়ভাবে একটি বিশেষ মনিটরিং সেল গঠন করা যেতে পারে, যারা সরাসরি শিক্ষকদের সাথে যোগাযোগ রাখবে এবং প্রতিটি ব্যয়ের হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশ করবে।


সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)

প্রশ্ন ১: খাতা দেখার সম্মানী সরাসরি কোন মাধ্যমে শিক্ষকদের দেওয়া হয়?

উত্তর: বর্তমানে বোর্ডগুলোতে ই-পেমেন্ট বা অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে সরাসরি পরীক্ষকদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানোর নিয়ম রয়েছে। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ডাটাবেজ ভুলের কারণে চেক মারফতও দেওয়া হয়।

প্রশ্ন ২: সম্মানী প্রাপ্তিতে দেরি হলে শিক্ষকরা কোথায় অভিযোগ জানাতে পারেন?

উত্তর: শিক্ষকরা তাদের সংশ্লিষ্ট শিক্ষক সংগঠনের মাধ্যমে যৌথভাবে অথবা সরাসরি মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ বক্সে লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেন।


উপসংহার ও শেষ কথা

পরীক্ষকদের সম্মানী নিয়ে এই নয়ছয় ও অনিয়ম বন্ধ হওয়া এখন সময়ের দাবি। পরীক্ষকদের সম্মানী আটকে রেখে সুদ খাওয়া কেবল অনৈতিক নয়, এটি একটি ফৌজদারি অপরাধ। শিক্ষকরা যখন তাদের নায্য অধিকার নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকেন, তখন তার নেতিবাচক প্রভাব পরোক্ষভাবে শিক্ষার্থীদের খাতা মূল্যায়ন ও ফলাফলের ওপরও পড়তে পারে।

আমরা আশা করি, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই কথিত ‘সুদ বাণিজ্য’ ও দুর্নীতির খবরটির সত্যতা কঠোরভাবে যাচাই করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনবে। শিক্ষকদের অধিকার ও শ্রমের নায্য পাওনা নিশ্চিত করাই হোক শিক্ষা প্রশাসনের মূল অঙ্গীকার।

শিক্ষা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *