স্কুল ভবনে ভয়াবহ ফাটল, বাধ্য হয়ে দোকানঘরে চলছে কোমলমতি শিশুদের ক্লাস!

একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মূল ভবনে ভয়াবহ ফাটল দেখা দেওয়ায় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাধ্য হয়ে পাশের একটি দোকানঘরে ক্লাস নিচ্ছেন শিক্ষকরা। গত ১১ মে ২০২৬ (সোমবার) সরেজমিনে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের ভবনটি অত্যন্ত জরাজীর্ণ এবং যেকোনো সময় ধসে পড়ার উপক্রম হয়েছে। বর্ষার মৌসুম শুরু হওয়ায় ছাদ দিয়ে পানি চুইয়ে পড়ার পাশাপাশি পলেস্তারা খসে পড়ছে, যা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জন্য মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে জীবনের ঝুঁকি এড়াতে বিকল্প এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।


মরণফাঁদ থেকে বাঁচতে দোকানের সরু পরিসরে শিক্ষা

ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণার প্রক্রিয়া চললেও বিকল্প কোনো সরকারি ব্যবস্থা না থাকায় প্রধান শিক্ষক স্থানীয় একটি মার্কেটের ছোট একটি দোকান ঘর ভাড়া নিয়ে পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে সাময়িক এই বিকল্প ব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের জন্য মোটেও আরামদায়ক নয়:

  • অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ: দোকানঘরে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস নেই এবং গাদাগাদি করে বসতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। গরমের দিনে বদ্ধ দোকানে ক্লাস করতে গিয়ে অনেক শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ছে।
  • উপকরণের অভাব: দোকানঘরের ভেতরে ব্ল্যাকবোর্ড ঝোলানোর মতো পর্যাপ্ত জায়গা নেই, নেই শিক্ষার্থীদের বসার জন্য প্রয়োজনীয় বেঞ্চ। মেঝেতে মাদুর বিছিয়ে অথবা ছোট টুল ব্যবহার করে শিক্ষার্থীরা ক্লাস করছে।
  • উপস্থিতি হ্রাস: এই চরম অব্যবস্থাপনার ফলে অনেক শিক্ষার্থী ইতিমধ্যে বিদ্যালয়ে আসা বন্ধ করে দিয়েছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সামগ্রিক শিক্ষা কার্যক্রমের ওপর। অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ওই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পাঠাতে ভয় পাচ্ছেন, আবার দোকানেও পড়াশোনার পরিবেশ পাচ্ছেন না।

আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও প্রশাসনিক গাফিলতির অভিযোগ

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ভবনটি সংস্কারের জন্য বারবার আবেদন করা হলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তা আলোর মুখ দেখেনি। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর (EED) ভবনটিকে অনেক আগেই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল, কিন্তু নতুন ভবন নির্মাণের বাজেট বা বরাদ্দ না আসায় এই মানবেতর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

শিক্ষকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, “আমরা নিরুপায় হয়ে এখানে ক্লাস নিচ্ছি। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে বসে ক্লাস নিলে যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, তবে তার দায় কে নেবে? তবে এভাবে দোকানে বসে দীর্ঘমেয়াদী শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব নয়।” পাঠদানের উপযুক্ত পরিবেশ না থাকায় সিলেবাস শেষ করা এবং পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া নিয়ে শিক্ষকরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

বিদ্যালয়ের সরঞ্জাম ও গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র রাখারও কোনো নিরাপদ জায়গা সেখানে নেই। এই সংকটের সর্বশেষ আপডেট বা নতুন ভবনের বরাদ্দ সংক্রান্ত তথ্য জানতে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (অফিসিয়াল ওয়েবসাইট)-এ নজর রাখা যেতে পারে।


কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও অস্থায়ী সমাধানের আশ্বাস

উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা বিষয়টি স্বীকার করে বলেছেন যে, নতুন ভবন নির্মাণের জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে অবহিত করা হয়েছে। তবে স্থায়ী ভবন নির্মাণের প্রক্রিয়া দীর্ঘ হওয়ায় অস্থায়ীভাবে শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো টিনশেড ঘর বা বিকল্প কোনো সরকারি ব্যবস্থা করার চেষ্টা চলছে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতায় দ্রুত এই সংকটের সমাধান না হলে বিদ্যালয়টি সম্পূর্ণ শিক্ষার্থীশূন্য হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ডিজিটাল ও স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্ন যেখানে প্রতিটি ঘরে পৌঁছেছে, সেখানে একটি জরাজীর্ণ স্কুল ভবন ও দোকানের ভেতরে পাঠদান অত্যন্ত দুঃখজনক।


শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ ও অবকাঠামোর গুরুত্ব

বিপজ্জনক ভবনে ক্লাস করা বা দোকানঘরে আটকে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য কেবল একটি একাডেমিক ক্ষতি নয়, এটি তাদের মানসিক বিকাশেও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি আদর্শ ও মনোরম বিদ্যালয়ের পরিবেশ শিক্ষার্থীর মেধা বিকাশে ৫০ শতাংশ ভূমিকা রাখে। সেখানে দোকানঘরে গাদাগাদি করে বসে থাকা শিশুদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের পথে বড় এক অন্তরায়।

এলাকাবাসীর দাবি, কোনো বড় ধরণের দুর্ঘটনা ঘটার আগেই যেন জরুরি ভিত্তিতে নতুন ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করা হয়। শিক্ষা বাজেট থেকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই বিদ্যালয়ের জন্য বিশেষ বরাদ্দ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সুশীল সমাজ। জরাজীর্ণ ভবনগুলো সংস্কারের ক্ষেত্রে কোনো ধরণের অবহেলা সহ্য করা হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন অভিভাবকরা।


সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)

প্রশ্ন ১: ঝুঁকিপূর্ণ স্কুল ভবনের বিষয়ে অভিযোগ জানানোর সঠিক মাধ্যম কোনটি?

উত্তর: যেকোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জরাজীর্ণ বা ঝুঁকিপূর্ণ হলে তাৎক্ষণিকভাবে উপজেলা শিক্ষা অফিস, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস এবং শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে (EED) লিখিতভাবে জানাতে হবে।

প্রশ্ন ২: নতুন ভবন নির্মাণ হতে কতদিন সময় লাগতে পারে?

উত্তর: সরকারি নিয়ম অনুযায়ী বাজেট পাস ও টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ করে একটি নতুন ভবন নির্মাণ হতে সাধারণত (নির্ধারিত সময়) প্রয়োজন হয়। তবে জরুরি পরিস্থিতিতে বিশেষ বরাদ্দের সুযোগ রয়েছে।


উপসংহার ও শেষ কথা

স্কুল ভবনের ফাটল এবং শিক্ষার্থীদের দোকানে বসে ক্লাস করার চিত্রটি আমাদের শিক্ষা অবকাঠামোর এক করুণ বাস্তবতা তুলে ধরেছে। এই সমস্যার দ্রুত সমাধান না হলে প্রান্তিক পর্যায়ের শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। দোকানঘর থেকে শিক্ষার্থীদের পুনরায় উপযুক্ত ক্লাসরুমে ফিরিয়ে নেওয়া এবং একটি নিরাপদ ভবন নিশ্চিত করাই হোক প্রশাসনের মূল লক্ষ্য। একটি প্রাণও যেন অবহেলা বা ভবন ধসের মতো দুর্ঘটনায় অকালে ঝরে না যায়।

শিক্ষার অধিকার কেবল খাতা-কলমে নয়, বরং একটি নিরাপদ অবকাঠামোতেও থাকা উচিত। আমরা আশা করি, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই খবরটির গুরুত্ব বিবেচনা করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। প্রশাসনের দ্রুত উদ্যোগের মাধ্যমেই ফিরবে শিক্ষার স্বাভাবিক ছন্দ।

শিক্ষা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *