ভুল সেটে পরীক্ষা নেওয়ার দায়ে দিনাজপুরে কেন্দ্র সচিব ও ট্যাগ অফিসার অব্যাহতি!

দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের অধীনে চলমান এসএসসি (SSC) পরীক্ষায় ভুল প্রশ্নপত্রের সেটে পরীক্ষা নেওয়ার দায়ে একটি পরীক্ষা কেন্দ্রের কেন্দ্র সচিব ও ট্যাগ অফিসারকে তাৎক্ষণিক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। গত ১১ মে ২০২৬ (সোমবার) সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড এবং জেলা প্রশাসন যৌথভাবে এই কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। গত ১০ মে অনুষ্ঠিত পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষায় নির্ধারিত সেটের পরিবর্তে অন্য সেটের প্রশ্নে পরীক্ষা শুরু করায় এই প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা ও জটিলতা তৈরি হয়।


অবহেলা ও বিভ্রান্তি: পরীক্ষার হলে যা ঘটেছিল

ঘটনাটি ঘটেছে দিনাজপুরের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা কেন্দ্রে। পাবলিক পরীক্ষার নিয়মানুযায়ী, পরীক্ষা শুরুর পূর্বে লটারির মাধ্যমে নির্ধারিত প্রশ্নপত্রের সেট কোড ঘোষণা করা হয় এবং সেই সেটেই পরীক্ষা নেওয়ার কথা থাকে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের চরম অবহেলার কারণে লটারির সেট বাদ দিয়ে ভুল কোডের প্রশ্ন পরীক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণ করা হয়।

পরীক্ষা শুরুর বেশ কিছুক্ষণ পর বিষয়টি পরীক্ষার্থী ও শিক্ষকদের নজরে আসলে কেন্দ্রজুড়ে তীব্র আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ে। বোর্ড কর্তৃপক্ষ ঘটনাটি জানার পর দ্রুত উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে এবং প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের অব্যাহতি দেয়।


পরীক্ষার্থীদের ফলাফলে প্রভাব পড়বে না: বোর্ডের আশ্বাস

এই অনাকাঙ্ক্ষিত ভুলের কারণে পরীক্ষার্থীদের ফলাফলে যেন কোনো নেতিবাচক বা ক্ষতিকর প্রভাব না পড়ে, সে বিষয়ে দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের বিশেষভাব আশ্বস্ত করেছে। বোর্ডের নেওয়া পদক্ষেপগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

  • বিশেষ মূল্যায়ন: দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, ভুল সেটে পরীক্ষা দেওয়া পরীক্ষার্থীদের ওএমআর (OMR) শিট এবং উত্তরপত্র বিশেষ গুরুত্বের সাথে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা হবে।
  • ডাটাবেসে বিশেষ নির্দেশনা: পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, এই পরীক্ষার্থীদের খাতা আলাদাভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কোডিং পদ্ধতিতে যেন কোনো জটিলতা না হয়, সে লক্ষে কম্পিউটার ডাটাবেসে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা তাদের নায্য নম্বর থেকেই বঞ্চিত হবে না।
  • বিভাগীয় মামলা: দায়িত্বে অবহেলার জন্য দায়ী কেন্দ্র সচিব ও ট্যাগ অফিসারের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই কঠোর বিভাগীয় মামলা করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণে চরম গাফিলতি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের স্পষ্ট ও কঠোর নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও কীভাবে ভুল সেটের প্রশ্ন বিতরণ করা হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিভাবক ও সচেতন মহল। কেন্দ্র সচিবের মূল দায়িত্ব ছিল প্রশ্নপত্রের সেট কোড সঠিকভাবে যাচাই করা। অন্যদিকে, ট্যাগ অফিসারের কাজ ছিল ট্রেজারি থেকে প্রশ্ন আনা এবং কেন্দ্রে বিতরণের সময় তা সঠিকভাবে তদারকি করা। উভয়ের সমন্বয়হীনতা ও গাফিলতির ফলেই কয়েকশ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছিল।

জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, পরীক্ষার মতো সংবেদনশীল বিষয়ে কোনো ধরণের ছাড় দেওয়া হবে না। অব্যাহতি প্রাপ্ত কর্মকর্তাদের স্থলে নতুন করে অভিজ্ঞ জনবল নিয়োগ দিয়ে কেন্দ্রের কার্যক্রম ইতিমধ্যেই স্বাভাবিক করা হয়েছে। এই ঘটনার পর দিনাজপুরের অন্যান্য সকল কেন্দ্রে বাড়তি সতর্কতা জারি করা হয়েছে যেন পরবর্তী পরীক্ষাগুলোতে একই ধরণের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে। বোর্ডের পরবর্তী সব নোটিশ ও নির্দেশনা (অফিসিয়াল ওয়েবসাইট)-এ প্রকাশ করা হবে।


প্রশ্নপত্র বিতরণে আধুনিক প্রযুক্তির ভাবনা

দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ পরীক্ষার্থীদের শান্ত থাকার এবং পরবর্তী পরীক্ষাগুলোতে সম্পূর্ণ মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। এই ধরণের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সামাল দিতে বোর্ড এখন থেকে প্রশ্নপত্র বিতরণের সময় ‘ডিজিটাল লগ সিস্টেম’ ব্যবহারের কথা চিন্তা করছে। এর মাধ্যমে কোনো কেন্দ্রে ভুল সেট খোলার চেষ্টা করলে সরাসরি কেন্দ্রীয় সার্ভারে সতর্কবার্তা চলে যাবে।

আগামী পরীক্ষাগুলোতে প্রশ্নপত্রের প্যাকেট খোলার ১০ মিনিট আগে লটারির মাধ্যমে সেট কোড নির্ধারণের বিষয়টি কঠোরভাবে মনিটর করা হবে। কোনো কেন্দ্রের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে এমন অভিযোগ পাওয়া গেলে স্থায়ীভাবে সেই পরীক্ষা কেন্দ্র বাতিল করার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে।


সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)

প্রশ্ন ১: ভুল সেটে পরীক্ষা দেওয়ার কারণে শিক্ষার্থীদের খাতা কি বাতিল হয়ে যাবে?

উত্তর: না, খাতা বাতিল হবে না। দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ড স্পষ্ট করেছে যে, শিক্ষার্থীদের উত্তরপত্র আলাদাভাবে চিহ্নিত করে বিশেষ গুরুত্বের সাথে মূল্যায়ন করা হবে এবং তারা তাদের প্রাপ্য নম্বরই পাবে।

প্রশ্ন ২: নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা পরীক্ষা কীভাবে পরিচালনা করবেন?

উত্তর: নতুন কর্মকর্তাদের ইতিমধ্যেই বিশেষ ওরিয়েন্টেশন দেওয়া হয়েছে। তারা শিক্ষা বোর্ডের নিয়মানুযায়ী লটারির সেট কোড কঠোরভাবে মিলিয়ে পরীক্ষা সম্পন্ন করবেন।


উপসংহার ও শেষ কথা

ভুল প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা গ্রহণ একটি বড় ধরণের প্রশাসনিক ব্যর্থতা হলেও, দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ড ও জেলা প্রশাসনের দ্রুত এবং কঠোর পদক্ষেপের কারণে বড় ধরণের ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়েছে। এই কঠোর অবস্থান ভবিষ্যতে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের আরও সতর্ক ও দায়িত্বশীল হতে বাধ্য করবে। পরীক্ষার হলে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সঠিক প্রশ্ন নিশ্চিত করা প্রশাসনের প্রধান দায়িত্ব, যেখানে কোনো শিথিলতা কাম্য নয়। আমরা সকল এসএসসি পরীক্ষার্থীর সাফল্য কামনা করি।

পরীক্ষা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *