পর্যায়ক্রমে শিক্ষার্থীদেরও ট্যাব দেবে সরকার: বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সভায় শিক্ষামন্ত্রী
শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বাড়লে শিক্ষকদের পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে শিক্ষার্থীদেরও ট্যাব (Tablet) দেওয়া হবে। গত ৮ মে ২০২৬ (শুক্রবার) বাংলা একাডেমির আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির (BAPUS) বার্ষিক সাধারণ সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই আশাবাদ ব্যক্ত করেন। ডিজিটাল শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে এটি সরকারের একটি অত্যন্ত দূরদর্শী ও যুগান্তকারী পরিকল্পনা।
সক্ষমতা বাড়লে প্রতিটি শিক্ষার্থীর হাতে পৌঁছাবে ট্যাব
শিক্ষামন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থার রোডম্যাপ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “বর্তমানে আমরা শিক্ষকদের ডিজিটাল কার্যক্রমের সুবিধার্থে ট্যাব প্রদান করছি। এরপর আস্তে-আস্তে আমরা সক্ষমতা অর্জন করলে শিক্ষার্থীদের হাতেও ট্যাব তুলে দেবো।”
এই ঘোষণার ফলে সারা দেশের সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও দুর্গম অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য এই উদ্যোগটি ‘ডিজিটাল ডিভাইড’ (Digital Divide) বা তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবধান ঘুচাতে এক ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখবে। মন্ত্রী স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে তথ্যপ্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের ওপর জোর দেন এবং শিক্ষার্থীদের মুখস্থ বিদ্যার পরিবর্তে সৃজনশীল শিক্ষায় অভ্যস্ত হওয়ার আহ্বান জানান।
ট্যাব ব্যবহার ও বই পড়ার গুরুত্ব: আধুনিক শিক্ষা দর্শন
প্রযুক্তি ব্যবহারের মানে এই নয় যে পাঠ্যবইয়ের প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়ে যাবে। বরং প্রযুক্তি ও বই—এই দুইয়ের সমন্বয়েই আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও বিশ্বমানের করে গড়ে তোলা হবে। শিক্ষামন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে আশির দশকে যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর কম্পিউটার সায়েন্স পড়ার অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে বলেন:
- প্রযুক্তির ইতিবাচক প্রভাব: সে সময় অনেকে ভেবেছিলেন কম্পিউটার মানুষের কর্মসংস্থান কমিয়ে দেবে, কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি বরং কর্মসংস্থান কয়েকগুণ বাড়িয়েছে। একইভাবে ট্যাব ব্যবহার করলে বই বন্ধ হয়ে যাবে না।
- পড়ার অভ্যাস ধরে রাখা: উন্নত বিশ্বে এখনো বাসে বা ট্রেনে মানুষকে বই পড়তে দেখা যায়, আমাদের দেশেও সেই বই পড়ার অভ্যাস ধরে রাখতে হবে।
- নোট-গাইড বই বিলুপ্তি: সৃজনশীল শিক্ষা ব্যবস্থায় নোট-গাইডের কোনো স্থান নেই। ২০২৬ সালের এই পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে শিক্ষাব্যবস্থা এমন দিকে ধাবিত হচ্ছে যে গাইড বইগুলো অদূর ভবিষ্যতে বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
তিনি প্রকাশকদের উদ্দেশে বলেন, ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গির পাশাপাশি সমাজ ও জাতিকে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত করার দায়বদ্ধতা থেকেও আপনাদের কাজ করতে হবে।
প্রকাশকদের প্রতি শিক্ষামন্ত্রীর বিশেষ পরামর্শ ও প্রস্তাবনা
শিক্ষাকে আরও সহজলভ্য ও মানসম্মত করতে শিক্ষামন্ত্রী পুস্তক প্রকাশকদের বেশ কিছু গঠনমূলক পরামর্শ দিয়েছেন:
- বই সরবরাহ: প্রকাশকরা চাইলে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের মতো শিক্ষার্থীদের পড়ার বই সরবরাহ করার উদ্যোগ নিতে পারেন।
- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন: প্রকাশক সমিতির পক্ষ থেকে চ্যারিটেবল স্কুল, কলেজ বা একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠারও প্রস্তাব দেন তিনি।
- সেন্ট্রাল এক্সিলেন্স: এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে একটি ‘সেন্ট্রাল এক্সিলেন্স’ থাকবে এবং সারা বাংলাদেশের মেধাবী কিন্তু সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের ট্রাস্টের মাধ্যমে পড়াশোনার বিশেষ সুযোগ দেওয়া হবে।
স্মার্ট নাগরিক গঠন ও শিক্ষা খাতের বৈপ্লবিক পরিবর্তন
সরকার ইতিপূর্বে কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৯ হাজার শিক্ষককে ট্যাব দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল। আর এখন সাধারণ শিক্ষার্থীদেরও এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার দূরদর্শী পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এটি মূলত মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে, যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা গ্লোবাল কনটেন্ট সহজে অ্যাক্সেস করতে পারবে।
প্রতিটি শিক্ষার্থীর হাতে ট্যাব পৌঁছে গেলে তারা টাইপিং, ডকুমেন্টেশন এবং প্রেজেন্টেশন তৈরির মতো গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল স্কিলগুলো ছোটবেলা থেকেই আয়ত্ত করতে পারবে। এর ফলে উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে তারা আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষার্থীদের সাথে পাল্লা দিতে সক্ষম হবে। মন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন যে, ব্যবহারিক ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাই হবে আগামীর মূল শক্তি।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
প্রশ্ন ১: শিক্ষার্থীদের ট্যাব দেওয়ার এই পরিকল্পনাটি কখন বাস্তবায়িত হবে?
উত্তর: শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর ভিত্তি করে পর্যায়ক্রমে শিক্ষার্থীদের হাতে ট্যাব তুলে দেওয়া হবে। এই প্রকল্পের সর্বশেষ আপডেট ও পাইলট কার্যক্রমের তথ্য জানতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের (অফিসিয়াল ওয়েবসাইট)-এ নজর রাখতে হবে।
প্রশ্ন ২: ট্যাব দিলে কি কাগজের পাঠ্যবই বা লাইব্রেরির গুরুত্ব কমে যাবে?
উত্তর: না, প্রযুক্তি কেবল শিক্ষার মাধ্যম বা সহায়ক হিসেবে কাজ করবে। জ্ঞানের মূল উৎস হিসেবে কাগজের বই এবং লাইব্রেরির গুরুত্ব অপরিবর্তিত থাকবে। প্রযুক্তি ও বইয়ের সমন্বয়েই শিক্ষা ব্যবস্থা আধুনিক হবে।
উপসংহার ও শেষ কথা
শিক্ষামন্ত্রীর এই ঘোষণাটি একটি আধুনিক, বৈষম্যহীন ও উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ার দৃঢ় অঙ্গীকার। ট্যাব বা প্রযুক্তি কেবল শিক্ষার মাধ্যম, আর বই হলো জ্ঞানের মূল উৎস। এই দুইয়ের মেলবন্ধনেই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বিশ্ব জয় করবে এবং ‘স্মার্ট নাগরিক’ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করবে। এই দূরদর্শী পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের মুখ দেখবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

