রাজনৈতিক মামলায় স্কুল শিক্ষার্থীদের কারাবাস: গভীর উদ্বেগে মানবাধিকার কর্মী ও শিক্ষাবিদ মহল
বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে রাজনৈতিক ও বিতর্কিত মামলায় বেশ কিছু স্কুল শিক্ষার্থীকে কারাগারে পাঠানোর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। গত ৮ মে ২০২৬ (শুক্রবার) প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, অনেক কিশোর শিক্ষার্থী বর্তমানে জেল হাজতে রয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইন ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দেওয়া হয়েছে। এই ধরণের মামলায় অপ্রাপ্তবয়স্কদের গ্রেফতার এবং জামিন না হওয়াকে কেন্দ্র করে মানবাধিকার কর্মীরা বড় ধরণের প্রশ্ন তুলছেন। কেবল রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য ছাড়াই এসব কিশোরকে মামলার জালে জড়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
আইনি জটিলতা ও ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনে চরম অনিশ্চয়তা
এই গণ-গ্রেফতারের ফলে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার উপক্রম হয়েছে। মাঠ পর্যায় থেকে প্রাপ্ত বেশ কিছু তথ্য শিক্ষার্থীদের এই করুণ পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরে:
- টেস্ট পরীক্ষা ও ফরম ফিলাপ (Form Fill-up) বঞ্চিত: জেলখানায় আটকে থাকার কারণে অনেক কিশোরই এসএসসির (SSC) টেস্ট পরীক্ষা দিতে পারেনি। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নিয়ম অনুযায়ী, টেস্ট পরীক্ষা ছাড়া ফরম ফিলাপ করা সম্ভব নয়। ফলে এই শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
- ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর জবানবন্দি: গত বছরের অক্টোবরে আটক হওয়া এক শিক্ষার্থী আক্ষেপ করে জানায়, পরের দিন তার এসএসসি-র ‘টেস্ট পরীক্ষা’ থাকা সত্ত্বেও পুলিশ তাকে ছাড়েনি। পরিবার ও স্থানীয়রা তার অল্প বয়সের কথা বললেও তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (OC) তাকে আইনি প্রক্রিয়ায় সোপর্দ করেন।
- জামিন অযোগ্য ধারা: বিশেষ ক্ষমতা আইন এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মতো কঠোর ধারার মারপ্যাঁচে আদালতে বারবার আবেদন করেও কিশোরদের মুক্তি মিলছে না।
আইনের লঙ্ঘন ও মানবাধিকার কর্মীদের উদ্বেগ
আইন ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৮ বছরের কম বয়সী কিশোরদের ক্ষেত্রে ‘শিশু আইন-২০১৩’ অনুযায়ী বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করার কথা। কিন্তু রাজনৈতিক মামলায় তাদের সাধারণ আসামিদের মতো বিবেচনা করা এবং জামিন না দেওয়া দেশের প্রচলিত আইনের চরম লঙ্ঘন।
মানবাধিকার কর্মীদের প্রধান আপত্তিগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. শিশু আইনের অবমাননা
আইন অনুযায়ী অপ্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণ আদালতে বিচার বা সাধারণ কারাগারে রাখা নিষিদ্ধ। কিন্তু নিষিদ্ধ সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলে কোনো প্রকার যাচাই ছাড়াই কিশোরদের সাধারণ কারাগারে রাখা হচ্ছে।
২. মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব
দীর্ঘদিন অন্ধকার প্রকোষ্ঠে আটকে থাকা এবং অপরাধী হিসেবে গণ্য হওয়া এই কোমলমতি কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক ও দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
৩. অপরাধী সংশোধনাগারের পরিবর্তে সাধারণ কারাগার
কিশোর অপরাধ সংশোধন কেন্দ্রে (Juvenile Correction Center) পাঠানোর পরিবর্তে তাদের সাধারণ কারাগারে বড় ও দাগী অপরাধীদের সাথে রাখা হচ্ছে। এর ফলে তারা ভবিষ্যতে আরও বড় অপরাধের দিকে ধাবিত হতে পারে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।
রাজনৈতিক প্রভাব ও ভবিষ্যৎ শিক্ষা জীবনের অনিশ্চয়তা
নিষিদ্ধ সংগঠনের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে যে অভিযান চালানো হয়েছে, তাতে প্রকৃত অপরাধীদের পাশাপাশি অনেক সাধারণ স্কুল পড়ুয়া কিশোরও ভুক্তভোগী হচ্ছে। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এসব কিশোরদের ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, সেটি অবশ্যই তদন্তের বিষয়। তবে বর্তমানে তারা যে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা তাদের সুন্দর ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
শিক্ষা সচেতন মহল মনে করছে, একটি গণতান্ত্রিক সমাজে শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। যদি কোনো শিক্ষার্থী ভুল পথে পরিচালিত হয়েও থাকে, তবে তাকে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া উচিত। কিন্তু জেল হাজতে আটকে রেখে তাদের পরীক্ষা দেওয়ার অধিকার কেড়ে নেওয়া কোনো সমাধান হতে পারে না। এই সংকট সমাধানে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জরুরি সমন্বয় প্রয়োজন।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
প্রশ্ন ১: ১৮ বছরের কম বয়সীদের রাজনৈতিক মামলায় সাধারণ কারাগারে রাখা কি আইনসম্মত?
উত্তর: না, শিশু আইন-২০১৩ অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সী যে কোনো কিশোরকে সাধারণ আসামির মতো ট্রিট করা বা সাধারণ কারাগারে রাখা আইনের লঙ্ঘন। তাদের ক্ষেত্রে বিশেষ সংশোধনাগার ব্যবহারের নিয়ম রয়েছে।
প্রশ্ন ২: কারাবন্দী শিক্ষার্থীরা কি জেলখানা থেকে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পেতে পারে?
উত্তর: আদালতের বিশেষ অনুমতি এবং স্বরাষ্ট্র ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ের মাধ্যমে কারাবন্দী শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে এর জন্য প্রথমে শিক্ষার্থীর টেস্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া বা সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের বিশেষ অনুমতির প্রয়োজন হয়।
উপসংহার ও শেষ কথা
স্কুল শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক মামলায় জড়িয়ে কারাগারে পাঠানোর বিষয়টি আমাদের সমাজ ও বিচার ব্যবস্থার এক রূঢ় বাস্তবতা তুলে ধরেছে। কিশোর বয়সের ভুল বা আবেগকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা অবিলম্বে বন্ধ হওয়া উচিত। কোনো নিরপরাধ শিক্ষার্থী যেন কেবল রাজনৈতিক তকমা লাগিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ না হারায়, সেটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
আমরা আশা করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিতর্কিত এই মামলাগুলোর দ্রুত ও সুষ্ঠু তদন্ত সম্পন্ন করবে। ন্যায়বিচারের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসুক এবং নির্দোষ শিক্ষার্থীরা যেন দ্রুত মুক্তি পেয়ে নিরাপদ পরিবেশে পুনরায় শ্রেণীকক্ষে ফেরার সুযোগ পায়। শিক্ষার আলো যেন কোনো অন্ধকার প্রকোষ্ঠে হারিয়ে না যায়।

