স্কুল ফিডিং কর্মসূচি: খাবার কেনার আগে গুণগত মান যাচাইয়ে প্রধান শিক্ষকদের বিশেষ নির্দেশনা জারি
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পুষ্টির চাহিদা পূরণ এবং বিদ্যালয়ে ধরে রাখার লক্ষ্যে সরকার দেশজুড়ে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি (School Feeding Programme) চালু রেখেছে। এই কর্মসূচির আওতায় শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণ করা খাবারের গুণগত মান বজায় রাখতে এক নতুন জরুরি নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (DPE) যৌথভাবে দেশের সকল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের এই কড়া নির্দেশ দিয়েছে। এখন থেকে শিক্ষার্থীদের জন্য যেকোনো ধরনের খাবার বা বিস্কুট কেনার আগে তার গুণগত মান ও মেয়াদ কঠোরভাবে যাচাই করতে হবে। কোমলমতি শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে এবং পুষ্টিকর খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে এই নির্দেশনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
নতুন নির্দেশনার পটভূমি ও মূল লক্ষ্য
বিগত কয়েক মাসে দেশের কিছু অঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরবরাহকৃত খাবারের মান নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে বাসি বা নিম্নমানের খাবার পরিবেশনের ফলে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হয়ে পড়েছে।
এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি প্রতিরোধ করতে এবং স্কুল ফিডিং কর্মসূচি-কে সম্পূর্ণ নিরাপদ করতে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর স্পষ্ট জানিয়েছে যে, শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রধান দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের। খাবার স্থানীয়ভাবে কেনা হোক বা কেন্দ্রীয়ভাবে সরবরাহ করা হোক না কেন, তা বিতরণের আগে মান পরীক্ষা করা এখন থেকে বাধ্যতামূলক।
স্কুল ফিডিং কর্মসূচি বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ তারিখসমূহ
নতুন এই কড়া নির্দেশনা মাঠ পর্যায়ে কঠোরভাবে কার্যকরের জন্য প্রশাসন থেকে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে:
- নির্দেশনা কার্যকরের তারিখ: এই বিশেষ নোটিশ প্রকাশের পর (নির্ধারিত তারিখ) থেকে দেশের সকল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এই নিয়ম কার্যকর হবে।
- খাবার সরবরাহকারীদের তালিকা হালনাগাদ: (বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী) আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে স্থানীয় মানসম্মত বেকারি ও খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরি করতে হবে।
- আকস্মিক পরিদর্শন ও তদারকি: আগামী (নির্ধারিত তারিখ) থেকে জেলা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তারা প্রতিটি বিদ্যালয়ের খাদ্য মজুত ও গুণগত মান যাচাই করতে আকস্মিক পরিদর্শনে যাবেন।
খাদ্য সামগ্রী কেনা ও গুণগত মান যাচাইয়ের সঠিক পদ্ধতি
বিদ্যালয়ের স্কুল ফিডিং কর্মসূচি সচল রাখতে প্রধান শিক্ষক এবং বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটিকে (SMC) খাবার কেনার সময় নির্দিষ্ট কিছু ধাপ অনুসরণ করতে হবে। নিচে এই পদ্ধতি ক্রমান্বয়ে তুলে ধরা হলো:
- অনুমোদিত বিক্রেতা নির্বাচন: শুধুমাত্র বিএসটিআই (BSTI) অনুমোদিত এবং সরকারিভাবে নিবন্ধিত ডিলার বা বেকারি থেকে খাবার বা উচ্চ-প্রোটিনযুক্ত বিস্কুট কিনতে হবে।
- মেয়াদ ও সীল পরীক্ষা: কার্টন বা প্যাকেটের গায়ে থাকা উৎপাদন এবং মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ (Expiry Date) ভালো করে মিলিয়ে নিতে হবে।
- নমুনা পরীক্ষা: লট থেকে কয়েকটি প্যাকেট খুলে খাবারের স্বাদ, গন্ধ এবং মচমচে ভাব শিক্ষকরা নিজেরা খেয়ে পরীক্ষা বা টেস্ট করবেন।
- স্টোর রুমের আর্দ্রতা যাচাই: যেখানে খাবার মজুত বা স্টোর করা হবে, সেই ঘরের পরিবেশ যেন সম্পূর্ণ শুকনা এবং পোকামাকড় মুক্ত থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
- বিতরণ রেজিস্টার মেইনটেইন: প্রতিদিন কতজন শিক্ষার্থীকে খাবার দেওয়া হলো এবং খাবারের ব্যাচ নম্বর কত, তা দৈনিক ডায়েরি বা খাতায় লিখে রাখতে হবে।
প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও ভাউচার সংরক্ষণ
স্কুল ফিডিং কর্মসূচি-র খাদ্য ক্রয়ের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে প্রধান শিক্ষকদের কিছু প্রয়োজনীয় নথিপত্র ফাইল আকারে শিক্ষা অফিসে জমা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত রাখতে হবে।
- ক্যাশ মেমো বা বিল ভাউচার: খাবার কেনার মূল ক্যাশ মেমো যেখানে ভ্যাট ও ট্যাক্সের বিবরণ থাকবে।
- খাদ্য পরীক্ষাগারের ছাড়পত্র: উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ল্যাব টেস্টের সার্টিফাইড কপির ফটোকপি।
- পরিচালনা কমিটির রেজোলিউশন: খাবার কেনার আগে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির নেওয়া সিদ্ধান্তের মূল খসড়া বা স্বাক্ষর খাতা।
- বিতরণ বিবরণী: শ্রেণীভিত্তিক শিক্ষার্থীদের স্বাক্ষর বা উপস্থিতির সাপেক্ষে তৈরি করা খাদ্য বিতরণ শীট।
বাজেট বরাদ্দ ও আর্থিক ফি সংক্রান্ত তথ্য
এই কর্মসূচির যাবতীয় খরচ সরকারি তহবিল এবং উন্নয়ন সহযোগীদের অনুদান থেকে মেটানো হয়ে থাকে।
- শিক্ষার্থীদের জন্য ফি: স্কুল ফিডিং কর্মসূচি-র খাবার পাওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের কোনো ধরনের ফি বা টাকা দিতে হবে না। এটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বিতরণ করা হবে।
- তহবিল প্রাপ্তি: সরকার প্রতি ত্রৈমাসিকে (বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী) বিদ্যালয়ের নির্দিষ্ট ব্যাংক অ্যাকাউন্টে খাবার কেনার বাজেট সরাসরি পাঠিয়ে দেবে।
- অতিরিক্ত খরচের নিয়ম: বরাদ্দকৃত বাজেটের বাইরে কোনো প্রধান শিক্ষক ব্যক্তিগতভাবে ঋণ করে বা অতিরিক্ত অর্থ খরচ করে খাবার কিনতে পারবেন না।
প্রধান শিক্ষক ও অভিভাবকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা বা সতর্কতা
কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ফুড পয়জনিং বা খাদ্যে বিষক্রিয়া থেকে রক্ষা করতে অধিদপ্তর থেকে কিছু বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
বিশেষ সতর্কবার্তা: কোনো প্যাকেটে যদি বাতাস ঢোকা বা ড্যাম (Damaged) অবস্থা দেখা যায়, তবে সেই খাবার কোনোভাবেই শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণ করা যাবে না। নিয়ম অমান্য করে নিম্নমানের খাবার খাওয়ালে সংশ্লিষ্ট প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
- খোলা খাবার নিষিদ্ধ: বাজার থেকে কেনা খোলা মিষ্টি, চানাচুর বা অস্বাস্থ্যকর বাসি কেক স্কুল ফিডিং কর্মসূচি-র তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
- অভিভাবকদের তদারকি: সন্তানরা স্কুল থেকে দেওয়া খাবার ছাড়া বাইরের কোনো নোংরা খাবার খাচ্ছে কিনা, সে বিষয়ে অভিভাবকদের নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
প্রশ্ন ১: খাবার কেনার সময় গুণগত মানে কোনো ত্রুটি পাওয়া গেলে প্রধান শিক্ষকের করণীয় কী?
উত্তর: খাবার বা বিস্কুটের মানে কোনো ঘাটতি থাকলে প্রধান শিক্ষক সেই লটের খাবার গ্রহণ করবেন না। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি লিখিতভাবে উপজেলা শিক্ষা অফিসারকে (UEO) জানাবেন এবং সরবরাহকারীকে ফেরত দেবেন।
প্রশ্ন ২: এই স্কুল ফিডিং কর্মসূচি কি দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চালু আছে?
উত্তর: বর্তমানে দেশের দারিদ্র্যপীড়িত ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে এই কর্মসূচি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চালু রয়েছে। ক্রমান্বয়ে এটি দেশব্যাপী (বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী) সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
উপসংহার
প্রাথমিক স্তরের শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি একটি দারুণ উদ্যোগ। তবে এই ভালো উদ্যোগটি যেন ভেস্তে না যায়, সেজন্য প্রধান শিক্ষকদের খাবার কেনার সময় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। মনে রাখবেন, সামান্য অবহেলাও কোমলমতি শিক্ষার্থীদের বড় ধরণের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলতে পারে। তাই প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও কমিটিকে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে, শেষ সময়ের জন্য অপেক্ষা না করে এখনই খাদ্য ক্রয়ের নতুন নিয়মগুলো ভালো করে বুঝে নিন। এই কর্মসূচির সবশেষ সরকারি নোটিশ ও খাবারের পুষ্টিমান সংক্রান্ত নির্দেশিকা সরাসরি দেখতে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (অফিসিয়াল ওয়েবসাইট)-এ নিয়মিত চোখ রাখুন।

