প্রাথমিক মূল্যায়ন পরীক্ষায় অতিরিক্ত ফি আদায়ের অভিযোগ: তদন্তে নামছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর

দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে শিক্ষা নিশ্চিত করার সরকারি নির্দেশনা থাকলেও তা অমান্য করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ২০২৩ শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রচলিত নতুন শিক্ষাক্রম অনুযায়ী প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণীর ধারাবাহিক বা প্রাথমিক মূল্যায়ন পরীক্ষায় অতিরিক্ত ফি আদায়ের অভিযোগ উঠেছে বেশ কিছু বিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে। দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার প্রধান শিক্ষকরা নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে প্রশ্নপত্র তৈরি ও পরীক্ষার খরচের নামে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে জোরপূর্বক এই অর্থ নিচ্ছেন বলে জানা গেছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (DPE) এই অনিয়মকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিয়েছে এবং দ্রুত দোষী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করার নির্দেশ দিয়েছে। কোমলমতি শিশুদের অভিভাবক এবং প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এই বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

অতিরিক্ত ফি আদায়ের পটভূমি ও বর্তমান পরিস্থিতি

সরকারের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে যে, প্রাথমিক স্তরের কোনো পরীক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোনো প্রকার টাকা বা ফি নেওয়া যাবে না। বিদ্যালয়ের আনুষঙ্গিক খরচ মেটানোর জন্য প্রতি বছর সরকার থেকে স্লিপ ফান্ড (SLIP Fund) বা বিশেষ প্রাক্কলিত বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়।

তা সত্ত্বেও বেশ কিছু বিদ্যালয়ে প্রাথমিক মূল্যায়ন পরীক্ষায় অতিরিক্ত ফি আদায়ের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। অনেক অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, ফি না দিলে তাদের সন্তানদের মূল্যায়নের খাতায় কম নম্বর দেওয়ার বা অনুপস্থিত দেখানোর ভয় দেখানো হচ্ছে। গ্রামীণ ও পিছিয়ে পড়া এলাকার দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য এই অনাকাঙ্ক্ষিত বাড়তি খরচের বোঝা বহন করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রশাসনিক তদন্ত ও গুরুত্বপূর্ণ তারিখসমূহ

এই আর্থিক অনিয়মের ঘটনা সামনে আসার পর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে কঠোর তদারকির নির্দেশ দিয়েছে। এই সংক্রান্ত তদন্ত প্রক্রিয়ার সম্ভাব্য সময়সূচি নিচে তুলে ধরা হলো:

  • তদন্ত কমিটি গঠনের তারিখ: অভিযোগ পাওয়ার পরপরই বিভাগীয় উপ-পরিচালকদের নেতৃত্বে একটি বিশেষ মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে।
  • মাঠ পর্যায়ে আকস্মিক পরিদর্শন: আগামী (নির্ধারিত তারিখ) থেকে বিভিন্ন উপজেলার স্কুলগুলোতে শিক্ষা কর্মকর্তারা আকস্মিক পরিদর্শনে যাবেন।
  • প্রতিবেদন জমা দেওয়ার শেষ সময়: (বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী) আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন অধিদপ্তরে জমা দিতে হবে।
  • শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ: তদন্তে অপরাধ প্রমাণিত হলে আগামী (নির্ধারিত তারিখ)-এর মধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রধান শিক্ষকদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অনিয়মের বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিলের সঠিক পদ্ধতি

যদি আপনার সন্তানের বিদ্যালয়েও প্রাথমিক মূল্যায়ন পরীক্ষায় অতিরিক্ত ফি আদায়ের অভিযোগ বা এমন কোনো ঘটনা ঘটে থাকে, তবে অভিভাবক হিসেবে আপনি ঘরে বসেই সুনির্দিষ্ট নিয়মে কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানাতে পারেন। নিচে step-by-step নিয়মাবলী দেওয়া হলো:

  1. প্রমাণ সংগ্রহ: বিদ্যালয় থেকে যদি কোনো লিখিত নোটিশ বা টাকার রশিদ (Receipt) দেওয়া হয়ে থাকে, তবে তার একটি স্পষ্ট ছবি বা কপি নিজের কাছে রাখুন।
  2. লিখিত আবেদন তৈরি: উপজেলা শিক্ষা অফিসার (UEO) বরাবর একটি লিখিত অভিযোগপত্র তৈরি করুন, যেখানে বিদ্যালয়ের নাম, প্রধান শিক্ষকের নাম এবং আদায়কৃত টাকার পরিমাণ স্পষ্ট উল্লেখ থাকবে।
  3. অনলাইন পোর্টালে প্রবেশ: সরাসরি অফিসে যেতে না চাইলে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের গণঅভিযোগ বা জিআরএস (GRS) পোর্টালে অথবা নির্দিষ্ট (অফিসিয়াল ওয়েবসাইট) লিঙ্কে প্রবেশ করুন।
  4. তথ্য সাবমিট: পোর্টালে আপনার নাম, মোবাইল নম্বর এবং সংগৃহীত প্রমাণের স্ক্যান কপি বা ছবি আপলোড করে অভিযোগটি সাবমিট করুন।
  5. ট্র্যাকিং নম্বর সংগ্রহ: আবেদন সফল হলে একটি ট্র্যাকিং নম্বর পাবেন, যা দিয়ে পরবর্তীতে আপনার অভিযোগের অগ্রগতি যাচাই করতে পারবেন।

প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও তথ্যের বিবরণ

শিক্ষা অফিসে বা তদন্ত কমিটির কাছে অভিযোগ জমা দেওয়ার সময় নিচে উল্লেখিত নথিপত্রগুলো সাথে রাখতে হবে:

  • অভিযোগকারীর পরিচয়পত্র: অভিভাবকের জাতীয় পরিচয়পত্রের (NID) একটি ফটোকপি।
  • শিক্ষার্থীর তথ্য: শিক্ষার্থীর রোল নম্বর, শ্রেণী এবং আইডি কার্ডের কপি।
  • টাকা আদায়ের রসিদ বা ডায়েরির লেখা: যদি কোনো রসিদ না দেওয়া হয়, তবে বিদ্যালয়ের ডায়েরিতে শিক্ষকের লিখে দেওয়া ফি সংক্রান্ত নির্দেশনার ছবি।
  • সাক্ষীদের স্বাক্ষর: একই বিদ্যালয়ের ভুক্তভোগী আরও ২-৩ জন অভিভাবকের স্বাক্ষর বা সম্মতিপত্র।

সরকারি বাজেট ও ফি সংক্রান্ত আইনি তথ্য

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের আইন অনুযায়ী প্রাথমিক স্তরের শিক্ষা সম্পূর্ণ অবৈতনিক এবং এখানে কোনো পরীক্ষা বা মূল্যায়নের জন্য আলাদা ফি নেওয়ার সুযোগ নেই।

  • মূল্যায়ন পরীক্ষার সরকারি ফি: সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রাথমিক মূল্যায়ন পরীক্ষায় কোনো ধরণের ফি নেওয়া সম্পূর্ণ অবৈধ। এর প্রকৃত ফি হলো ০ (শূন্য) টাকা।
  • স্লিপ ফান্ড বরাদ্দ: প্রশ্নপত্র তৈরি বা ফটোকপির খরচের জন্য প্রতিটি বিদ্যালয়কে প্রতি বছর সরকারি তহবিল থেকে (বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী) বড় অঙ্কের স্লিপ ফান্ড দেওয়া হয়।
  • জরিমানা ও শাস্তি: অবৈধভাবে টাকা নেওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের বেতন গ্রেড কর্তন বা চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্তের মতো আইনি বিধান রয়েছে।

অধিদপ্তর কর্তৃক প্রধান শিক্ষক ও অভিভাবকদের জন্য জরুরি নির্দেশনা

এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা প্রতিরোধে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে একটি বিশেষ নোটিশ জারি করা হয়েছে।

বিশেষ সতর্কবার্তা: কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় যদি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রিন্ট বা ফটোকপির অজুহাতে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ১ টাকাও আদায় করে, তবে তা আর্থিক দুর্নীতির শামিল হবে। এই বিষয়ে শূন্য সহনশীলতা বা জিরো টলারেন্স (Zero Tolerance) নীতি অনুসরণ করা হবে।

  • অভিভাবকদের সচেতনতা: শিক্ষকরা মৌখিকভাবে বা ভয় দেখিয়ে টাকা চাইলে কখনোই তা দেবেন না। যেকোনো অনিয়ম তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয় শিক্ষা কমিটিকে জানান।
  • প্রশ্নপত্রের ধরণ: নতুন শিক্ষাক্রম অনুযায়ী মূল্যায়নের জন্য বড় কোনো লিখিত পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ছাপানোর প্রয়োজন নেই। শিক্ষকদের ক্লাস রুটিন অনুযায়ী ধারাবাহিক মূল্যায়ন ডায়েরি মেইনটেইন করতে হবে।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)

প্রশ্ন ১: বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বা কিন্ডারগার্টেনগুলোও কি এই নিয়মের আওতায় পড়বে?

উত্তর: সরকার নির্ধারিত ফির নিয়মটি প্রধানত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর জন্য কঠোরভাবে প্রযোজ্য। তবে বেসরকারি বা কিন্ডারগার্টেনগুলোও ইচ্ছেমতো অতিরিক্ত ফি (বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী) আদায় করতে পারবে না, তাদেরও স্থানীয় শিক্ষা অফিসের গাইডলাইন মানতে হবে।

প্রশ্ন ২: প্রাথমিক মূল্যায়ন পরীক্ষায় অতিরিক্ত ফি আদায়ের অভিযোগ প্রমাণিত হলে টাকা ফেরত পাওয়া যাবে কি?

উত্তর: হ্যাঁ, তদন্তে কোনো বিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে জোরপূর্বক টাকা নেওয়ার প্রমাণ মিললে, প্রশাসন সেই টাকা অভিভাবকদের কাছে ফেরত দিতে বাধ্য করবে এবং বিদ্যালয়ের ফান্ড স্থগিত (বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী) করা হবে।

উপসংহার

প্রাথমিক শিক্ষা হলো একটি শিশুর ভবিষ্যৎ গড়ার প্রথম ধাপ। এখানে প্রাথমিক মূল্যায়ন পরীক্ষায় অতিরিক্ত ফি আদায়ের অভিযোগ ওঠার মতো ঘটনা দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সুনাম ক্ষুণ্ন করে। সরকার যেখানে প্রতিটি শিশুর দোরগোড়ায় বিনামূল্যে শিক্ষা পৌঁছে দিতে বদ্ধপরিকর, সেখানে কিছু অসাধু শিক্ষকের এমন কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা সকল সচেতন অভিভাবককে অনুরোধ করব, আপনারা কোনো অন্যায় দাবির কাছে মাথা নত করবেন না এবং দ্রুত যেকোনো অনিয়মের তথ্য প্রশাসনকে জানান। এই তদন্তের সর্বশেষ আপডেট এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের জরুরি সার্কুলারগুলো সরাসরি দেখতে অধিদপ্তরের অফিশিয়াল (অফিসিয়াল ওয়েবসাইট)-এ নিয়মিত চোখ রাখুন।

শিক্ষা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *