দেশের ১০ হাজারেরও বেশি বিদ্যালয়ে নেই খেলার মাঠ: প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ
দেশের প্রাথমিক শিক্ষার অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও আধুনিকায়নে নানামুখী পদক্ষেপ নেওয়া হলেও একটি মৌলিক বিষয়ে বড় ঘাটতি সামনে এসেছে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায় মিলিয়ে বর্তমানে দেশের ১০ হাজারেরও বেশি বিদ্যালয়ে নেই খেলার মাঠ (Schools do not have playgrounds)। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (DPE) কর্তৃক পরিচালিত সাম্প্রতিক এক বার্ষিক জরিপ ও প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। কোমলমতি শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ এবং বিদ্যালয়ে ধরে রাখার ক্ষেত্রে একটি উপযুক্ত মাঠ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মাঠ না থাকার কারণে লাখ লাখ শিশু খেলাধুলা ও সুস্থ বিনোদন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যা তাদের স্বাভাবিক শৈশবকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে।
খেলার মাঠ সংকটের পটভূমি ও বর্তমান পরিস্থিতি
একটি আদর্শ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো সেখানে শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত উন্মুক্ত জায়গা ও মাঠ থাকবে। তবে বাস্তব চিত্র বলছে, বিশেষ করে শহরাঞ্চল এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় গড়ে ওঠা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কিন্ডারগার্টেনগুলোর বেশিরভাগেরই নিজস্ব কোনো জমি নেই।
প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, দেশের ১০ হাজারেরও বেশি বিদ্যালয়ে নেই খেলার মাঠ—যার ফলে শিক্ষার্থীরা শুধুমাত্র চার দেয়ালের মাঝে বন্দি হয়ে পড়ালেখা করছে। অনেক বিদ্যালয় ভাড়াবাড়িতে অথবা সংকীর্ণ জায়গায় পরিচালিত হওয়ায় বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার (Annual Sports Competition) মতো জরুরি ইভেন্টগুলোও আয়োজন করতে পারছে না। শিক্ষা গবেষকরা মনে করছেন, পর্যাপ্ত কায়িক পরিশ্রমের অভাব ও খেলাধুলা করতে না পারার কারণে শিশুদের মাঝে স্থূলতা ও একাকীত্ব বাড়ছে।
মাঠ সংকটের পরিসংখ্যান ও গুরুত্বপূর্ণ তারিখসমূহ
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এই মাঠ সংকটের সঠিক ডাটাবেজ তৈরি এবং তা নিরসনে একটি বিশেষ মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এই সংক্রান্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও সময়সূচি নিচে দেওয়া হলো:
- জরিপ সম্পন্ন হওয়ার তারিখ: দেশের সব জেলার তথ্য সংগ্রহ করে (নির্ধারিত তারিখ) এই চূড়ান্ত পরিসংখ্যান তৈরি করা হয়েছে।
- মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পেশ: আগামী (নির্ধারিত তারিখ)-এর মধ্যে এই মাঠ সংকটের বিস্তারিত বিবরণী প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেওয়া হবে।
- নতুন নীতিমালা বাস্তবায়ন: খেলার মাঠবিহীন নতুন কোনো বিদ্যালয়ের অনুমোদন না দেওয়ার কঠোর নিয়ম আগামী (নির্ধারিত তারিখ) থেকে পুরোপুরি কার্যকর হবে।
মাঠ সমস্যা সমাধানে শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রস্তাবিত পদ্ধতি
যেসব বিদ্যালয়ে নিজস্ব মাঠ নেই, সেখানে শিক্ষার্থীদের বিকল্প উপায়ে খেলাধুলার সুযোগ করে দিতে অধিদপ্তর কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবছে। নিচে এই পরিকল্পনাগুলো ধাপে ধাপে দেওয়া হলো:
- যৌথ মাঠ ব্যবহার: কাছাকাছি অবস্থিত দুটি বা তিনটি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যেন একটি নির্দিষ্ট বড় মাঠ ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে পারে, তার ব্যবস্থা করা।
- স্থানীয় পার্ক বা উন্মুক্ত স্থান নির্বাচন: পৌরসভার পার্ক বা স্থানীয় সরকারি খাস জমিকে (Khas Land) সপ্তাহের নির্দিষ্ট কিছু দিনে স্কুলের খেলাধুলার জন্য বরাদ্দ নেওয়া।
- ইনডোর গেমসের ব্যবস্থা: বড় মাঠ তৈরি করা সম্ভব না হলে সাময়িকভাবে বিদ্যালয়ের ভেতরেই টেবিল টেনিস, দাবা বা ক্যারমের মতো ইনডোর গেমসের (Indoor Games) সুবিধা বাড়ানো।
- নতুন জমি কেনা: যেসব সরকারি বিদ্যালয়ের আশেপাশে ফাঁকা জায়গা রয়েছে, সেখানে সরকারি তহবিল থেকে জমি কিনে মাঠ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া।
নতুন বিদ্যালয় স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র
শিক্ষা অধিদপ্তর জানিয়েছে, এখন থেকে যেকোনো নতুন বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বা কিন্ডারগার্টেন স্থাপনের অনুমতি (Registration) পেতে হলে মাঠ সংক্রান্ত নথিপত্র জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক।
- জমির তফসিল ও নকশা: বিদ্যালয়ের নামে থাকা জমির মূল দলিল এবং সেখানে মাঠের জন্য নির্ধারিত অংশের স্পষ্ট ম্যাপ বা নকশা।
- স্থানীয় শিক্ষা অফিসের প্রত্যয়নপত্র: সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা সরেজমিনে মাঠ পরিদর্শন করে যে ছাড়পত্র (Clearance Certificate) দেবেন, তার কপি।
- ভাড়ার চুক্তিপত্র: ভাড়া করা বাড়ি হলে বাড়ির ছাদ বা সংলগ্ন কোনো খোলা জায়গা ব্যবহারের লিখিত চুক্তিপত্র বা অনুমতি।
বাজেট বরাদ্দ ও সরকারি ফি সংক্রান্ত তথ্য
খেলার মাঠের সমস্যা দূর করতে সরকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (ADP) বিশেষ বাজেট বরাদ্দের পরিকল্পনা করছে।
- জমি ক্রয়ের বিশেষ তহবিল: যেসব সরকারি বিদ্যালয়ে মাঠ নেই, সেগুলোর জন্য সরকার আগামী অর্থবছর থেকে বিশেষ তহবিল (বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী) গঠন করতে পারে।
- আবেদন বা মনিটরিং ফি: মাঠের তথ্য হালনাগাদ করার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারিভাবে কোনো ফি প্রদান করতে হবে না। এটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করা যাবে।
- ক্রীড়া সামগ্রী অনুদান: মাঠ না থাকা বিদ্যালয়গুলোতে ইনডোর গেমসের সামগ্রী কেনার জন্য বিশেষ অনুদান (বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী) দেওয়া হবে।
প্রতিষ্ঠান প্রধান ও পরিচালনা কমিটির জন্য জরুরি নির্দেশনা
এই সংকটময় পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে দেশের সকল বিদ্যালয় প্রধান ও ম্যানেজিং কমিটির (SMC) জন্য বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
বিশেষ সতর্কবার্তা: যেসব বিদ্যালয়ের নিজস্ব খেলার মাঠ রয়েছে, তা কোনো অবস্থাতেই বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে বা মেলা আয়োজনের জন্য লিজ দেওয়া যাবে না। মাঠের জায়গায় নতুন কোনো ভবন তৈরি করার আগে অবশ্যই অধিদপ্তরের পূর্বানুমতি নিতে হবে।
- টিফিন পিরিয়ডের ব্যবহার: মাঠ না থাকলেও টিফিনের সময় শিশুদের যেন ক্লাসরুমে আটকে না রেখে বারান্দা বা নিরাপদ খোলা জায়গায় সামান্য হাঁটাচলার সুযোগ দেওয়া হয়।
- সহপাঠ্যক্রমিক কার্যক্রম: সপ্তাহে অন্তত একদিন শরীরচর্চা (Physical Exercise) এবং পিটি (PT) করানোর বিষয়টি প্রধান শিক্ষকদের নিশ্চিত করতে হবে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
প্রশ্ন ১: দেশের ১০ হাজারেরও বেশি বিদ্যালয়ে নেই খেলার মাঠ—এই তালিকায় কি শুধু বেসরকারি স্কুল রয়েছে?
উত্তর: না, এই তালিকায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও রয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা ও অন্যান্য বিভাগীয় শহরের পুরনো সরকারি স্কুলগুলোর একটি বড় অংশে মাঠের তীব্র সংকট রয়েছে।
প্রশ্ন ২: মাঠ না থাকলে কি নতুন কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নিবন্ধন বাতিল হতে পারে?
উত্তর: সরাসরি নিবন্ধন বাতিল না হলেও, নতুন নীতিমালার শর্ত পূরণ না করলে এবং বিকল্প কোনো খেলার জায়গা দেখাতে না পারলে সংশ্লিষ্ট স্কুলের অনুমোদন নবায়ন (বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী) স্থগিত করা হতে পারে।
উপসংহার
একটি শিশুর সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠার জন্য বইয়ের পাতার পাশাপাশি খেলার মাঠের সবুজ ঘাসও সমভাবে জরুরি। দেশের ১০ হাজারেরও বেশি বিদ্যালয়ে নেই খেলার মাঠ—এই বাস্তব চিত্রটি আমাদের পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতাকে নির্দেশ করে। শিক্ষার মান উন্নত করার পাশাপাশি শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষায় প্রতিটি বিদ্যালয়ে খেলার মাঠ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। আমরা আশা করি, সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন দ্রুত এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। এই মাঠ সংকট সংক্রান্ত অধিদপ্তরের নতুন প্রজেক্ট এবং শিক্ষা সংবাদের যেকোনো জরুরি নির্দেশনা সরাসরি দেখতে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অফিশিয়াল (অফিসিয়াল ওয়েবসাইট)-এ নিয়মিত চোখ রাখুন।

