প্রশিক্ষণ ছাড়া শিক্ষককে ক্লাসরুমে পাঠানো শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে জুয়া খেলার শামিল: ববি হাজ্জাজ
দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এবং পাঠদানের গুণগত মান নিশ্চিত করতে এক সাহসী ও দূরদর্শী মন্তব্য করেছেন এনডিপি (NDP) চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, আধুনিক ও কার্যকর শিক্ষা ব্যবস্থা গড়তে হলে শিক্ষকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। এখন থেকে কোনো শিক্ষককে প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ প্রদান না করে সরাসরি ক্লাসরুমে পাঠদানের জন্য পাঠানো উচিত হবে না বলে তিনি জোরালো মত প্রকাশ করেছেন।
মনস্তত্ত্ব ও আধুনিক শিক্ষা পদ্ধতির মেলবন্ধন
শিক্ষকদের পেশাদারিত্বের অভাব এবং সনাতন পাঠদান পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে ববি হাজ্জাজ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোকপাত করেন:
- শিক্ষকতার প্রকৃত মানদণ্ড: ববি হাজ্জাজ মনে করেন, একজন শিক্ষকের কেবল পাঠ্যবইয়ের তাত্ত্বিক জ্ঞান থাকলেই তিনি দক্ষ হতে পারেন না; বরং শিক্ষার্থীদের মনস্তত্ত্ব বোঝা এবং আধুনিক শিক্ষা পদ্ধতির সাথে পরিচিত হওয়া সমান জরুরি।
- মেধা বিকাশে বাধা: প্রশিক্ষণবিহীন শিক্ষক অনেক সময় কোমলমতি শিক্ষার্থীদের সুপ্ত প্রতিভা ও সৃজনশীলতা বিকাশের পথে অজান্তেই বাধা হয়ে দাঁড়ান।
- জাতীয় স্বার্থে প্রশিক্ষণ: বর্তমান যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হলে শিক্ষকদের ডিজিটাল লিটারেসি (Digital Literacy) এবং সৃজনশীল পাঠদান পদ্ধতিতে দক্ষ হতেই হবে। তাই জাতীয় স্বার্থেই প্রতিটি শিক্ষকের জন্য বাধ্যতামূলক ও মানসম্মত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি।
দক্ষ শিক্ষক ও মানসম্মত শিক্ষার যোগসূত্র: বৈশ্বিক মডেলের তাগিদ
উন্নত বিশ্বের শিক্ষা কাঠামোর উদাহরণ টেনে ববি হাজ্জাজ বাংলাদেশের বর্তমান নিয়োগ ও পদায়ন ব্যবস্থার সংস্কার দাবি করেন। তাঁর বক্তব্যের মূল নির্যাস নিচে তুলে ধরা হলো:
১. দীর্ঘমেয়াদী ইন্টার্নশিপের প্রয়োজনীয়তা
উন্নত দেশগুলোতে একজন শিক্ষককে ক্লাসরুমে পাঠানোর আগে দীর্ঘ মেয়াদী প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ও ইন্টার্নশিপের (Internship) মধ্য দিয়ে যেতে হয়। বাংলাদেশেও সেই বৈশ্বিক মডেল অনুসরণ করা প্রয়োজন। কেবল বিসিএস (BCS) বা অন্যান্য নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া মানেই একজন ভালো শিক্ষক হওয়া নয়; ক্লাসরুম ম্যানেজমেন্ট এবং ইন্টারঅ্যাক্টিভ লার্নিংয়ের জন্য বিশেষ প্রায়োগিক দক্ষতার প্রয়োজন।
২. সেকেলে পদ্ধতির অবসান
প্রশিক্ষিত শিক্ষক জানেন কীভাবে একটি কঠিন ও জটিল বিষয়কে আনন্দের ছলে সহজভাবে উপস্থাপন করতে হয়। প্রশিক্ষণের অভাবে অনেক সময় শিক্ষকরা পুরনো ও একঘেয়েমি পদ্ধতিতে পাঠদান করেন, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে পড়াশোনার প্রতি এক ধরণের অনীহা ও ভীতি তৈরি করে।
৩. বেসরকারি খাতের সমন্বয়
এই সংস্কার প্রক্রিয়ায় সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের শিক্ষকদের সমান সুযোগ দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। দেশের বহু বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের কোনো সুব্যবস্থা নেই, যা শিক্ষার সামগ্রিক মানকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের পর একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ফাউন্ডেশন ট্রেনিং বাধ্যতামূলক করা উচিত। এ সংক্রান্ত সরকারি শিক্ষক প্রশিক্ষণ (TTC) ও শিক্ষা নীতিমালার আপডেট জানতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের (অফিসিয়াল ওয়েবসাইট) ভিজিট করতে পারেন।
‘স্মার্ট শিক্ষা’ ও আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ
ববি হাজ্জাজ মনে করেন, স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে হলে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে সবার আগে স্মার্ট করতে হবে। আর সেই স্মার্টনেসের মূলে থাকবেন দক্ষ, আধুনিক ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকরা। প্রশিক্ষণ ছাড়া ক্লাসরুমে শিক্ষক পাঠানো মানে হলো শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে জুয়া খেলা। এই ধারা বন্ধ করতে সরকারকে কঠোর ও যুগোপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন করার আহ্বান জানান তিনি।
শিক্ষকদের মূল্যায়নে স্বাধীন সংস্থা: শিক্ষকদের বেতন ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির পাশাপাশি তাদের কর্মদক্ষতা ও ক্লাসরুম পারফরম্যান্স মূল্যায়নের জন্য একটি স্বাধীন সংস্থা থাকা প্রয়োজন। প্রশিক্ষণে যারা ভালো ফলাফল করবেন, তাদের বিশেষ ইনসেনটিভ (Incentive) বা দ্রুত পদোন্নতির ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এটি শিক্ষকদের মধ্যে প্রতিনিয়ত নতুন কিছু শেখার আগ্রহ বাড়াবে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
প্রশ্ন ১: বর্তমানে বাংলাদেশে সরকারি মাধ্যমিক ও প্রাথমিক শিক্ষকদের জন্য কী ধরণের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে?
উত্তর: সরকারিভাবে শিক্ষকদের জন্য বর্তমানে বিপিএড (BPEd), ডিপিএড (DPEd), বিএড (BEd) এবং জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখার ওপর বিভিন্ন শর্ট-টার্ম ইন-সার্ভিস প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে।
প্রশ্ন ২: প্রশিক্ষণবিহীন শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়াতে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ কী হতে পারে?
উত্তর: প্রতিটি বিদ্যালয়ে অভিজ্ঞ শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে মেন্টরিং প্রোগ্রাম এবং ছুটির দিনগুলোতে আইসিটি ও আধুনিক টিচিং মেথডোলজির ওপর বিশেষ কর্মশালার আয়োজন করা যেতে পারে।
উপসংহার ও শেষ কথা
প্রশিক্ষণ ছাড়া শিক্ষককে ক্লাসরুমে না পাঠানোর এই প্রস্তাবনাটি শিক্ষা খাতের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যার একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে। এই সিদ্ধান্তটি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মোড় আমূল ঘুরে যাবে। এটি কেবল শিক্ষকদের মান ও মর্যাদা উন্নত করবে না, বরং শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশেও একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটাবে।
প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকরাই পারেন একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজকে আলোর পথ দেখাতে। আমরা আশা করি, নীতিনির্ধারকরা এই বিষয়ের গভীরতা ও গুরুত্ব অনুধাবন করবেন এবং দেশের সকল স্তরের শিক্ষকদের জন্য একটি যুগোপযোগী ও বাধ্যতামূলক ‘জাতীয় প্রশিক্ষণ নীতিমালা’ তৈরি করবেন। আমরা একটি নিবেদিতপ্রাণ, শিক্ষিত ও দক্ষ শিক্ষক সমাজ এবং বৈশ্বিক মানের নতুন প্রজন্মের অপেক্ষায় আছি।

