শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে দলীয়করণ মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে: রুমিন ফারহানা

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে দলীয়করণ জেঁকে বসেছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি নেত্রী ও সাবেক সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। তিনি অভিযোগ করেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) নিয়োগ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে মেধার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয়কে একক প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। এই ধরণের চর্চা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মেরুদণ্ড সম্পূর্ণ ভেঙে দিচ্ছে বলে তিনি হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন।


মেধার অবমূল্যায়ন ও দলীয় ক্যাডার তৈরির কারখানা

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর অভ্যন্তরীণ পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে রুমিন ফারহানা বিভিন্ন স্তরের অনিয়ম তুলে ধরেন:

  • আনুগত্যই বড় যোগ্যতা: যেখানে মেধা এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ ও পদায়ন হওয়ার কথা, সেখানে রাজনৈতিক আনুগত্যই এখন সবচেয়ে বড় যোগ্যতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে প্রকৃত শিক্ষাবিদ ও মেধাবীরা কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন।
  • তৃণমূল স্তরে আধিপত্য: তৃণমূল পর্যায়ের স্কুল কমিটিগুলোতে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব এতই বেশি যে, সেখানে শিক্ষার পরিবেশের চেয়ে আধিপত্য বিস্তারই মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। এটি কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
  • মুক্তবুদ্ধির চর্চায় বাধা: শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন শিক্ষার আলো ছড়ানোর বদলে দলীয় ক্যাডার তৈরির কারখানায় পরিণত হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে জাতির জন্য এক ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে।

উচ্চশিক্ষা ও উপাচার্য নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব

উচ্চশিক্ষা স্তরে দলীয়করণের ভয়াবহতা তুলে ধরে রুমিন ফারহানা বলেন, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে একাডেমিক এক্সিলেন্স বা যোগ্যতার চেয়ে কে কতো বড় দলীয় অনুসারী, সেটিই মূল বিচার্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বর্তমান সংকটের প্রধান দিকগুলো হলো:

১. স্বায়ত্তশাসন ও মুক্তবুদ্ধির সংকট

দলদাস ভিসিদের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের স্বায়ত্তশাসন ও গবেষণার প্রকৃত পরিবেশ হারিয়ে ফেলছে। ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্র সংসদ বা মুক্তবুদ্ধির স্বাধীন চর্চা এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

২. শিক্ষক নিয়োগে জালিয়াতি

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগেও এখন নজিরবিহীন জালিয়াতি ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রে যোগ্য ও প্রকৃত গবেষক প্রার্থীদের বাদ দিয়ে কেবল দলীয় ট্যাগ থাকায় অযোগ্যদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।

৩. বিশ্ব র‍্যাঙ্কিংয়ে বিপর্যয়

উচ্চশিক্ষার মান আন্তর্জাতিক মানদণ্ড থেকে ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশ্ব র‍্যাঙ্কিংয়ে সম্মানজনক স্থান না পাওয়ার এটি অন্যতম প্রধান কারণ। এই ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, উপাচার্য নিয়োগের জন্য একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সার্চ কমিটি গঠন করা এখন সময়ের দাবি।


শিক্ষা ব্যবস্থাকে রাজনীতিমুক্ত করার প্রস্তাবনা ও আগামীর পথ

রুমিন ফারহানা দেশের সাধারণ মানুষ ও ছাত্র সমাজকে শিক্ষার এই করুণ অবস্থার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি মনে করেন, শিক্ষাকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে না রাখতে পারলে মেধাবী ও দক্ষ প্রজন্ম তৈরি হবে না। শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারে তিনি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব পেশ করেন:

  1. পরিচালনা পর্ষদে সংস্কার: প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের পদায়ন বন্ধ করে স্থানীয় অভিভাবক ও বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগীদের অগ্রাধিকার দিতে হবে।
  2. স্বাধীন শিক্ষক নিয়োগ কমিশন: শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় শতভাগ স্বচ্ছতা আনতে পিএসসির (PSC) মতো একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ‘শিক্ষক নিয়োগ কমিশন’ গঠন করতে হবে।
  3. পেশাদারিত্ব নিশ্চিতকরণ: শিক্ষা প্রশাসন ও একাডেমিক কার্যক্রমে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)

প্রশ্ন ১: পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) নিয়োগের বর্তমান আইনি প্রক্রিয়া কী?

উত্তর: প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চ্যান্সেলর তথা মহামান্য রাষ্ট্রপতির অনুমতিক্রমে শিক্ষা মন্ত্রণালয় উপাচার্য নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করে। তবে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশে সিনেটের মাধ্যমে প্যানেল নির্বাচনের বিধানও রয়েছে।

প্রশ্ন ২: শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ বন্ধে সাধারণ মানুষের ভূমিকা কী হতে পারে?

উত্তর: সচেতন অভিভাবক, স্থানীয় শিক্ষানুরাগী এবং নাগরিক সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় স্কুল-কলেজের ম্যানেজিং কমিটিতে যোগ্য ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা এবং যেকোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া জরুরি।


উপসংহার ও শেষ কথা

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের এই অভিযোগ দেশের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে মেধার সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করা না গেলে আমরা একটি জ্ঞানহীন ও মেরুদণ্ডহীন জাতিতে পরিণত হব।

রুমিন ফারহানার এই আহ্বান কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং এটি আমাদের জাতীয় শিক্ষা সংকটের একটি তিক্ত প্রতিচ্ছবি। স্মার্ট বা উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন কেবল তখনই সফল হবে, যখন আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে এবং শিক্ষকরা কোনো রাজনৈতিক প্রভাব ছাড়াই নির্দলীয়ভাবে পাঠদান করতে পারবেন। শিক্ষার পবিত্রতা রক্ষায় এই দলীয়করণের বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলা এখন সময়ের দাবি।

শিক্ষা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *