শ্রেণিকক্ষে ফাটল, বারান্দায় পাঠদান: জরাজীর্ণ স্কুল ভবনে দুর্ঘটনার আতঙ্ক, সংস্কারে দীর্ঘসূত্রতা

দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার এক করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে একটি জরাজীর্ণ স্কুল ভবনের বেহাল দশায়। শ্রেণিকক্ষের ছাদ ও দেয়ালে বড় বড় ফাটল দেখা দেওয়ায় যেকোনো সময় ভবনটি ধসে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শ্রেণিকক্ষে বসতে রাজি নয় কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। ফলে নিরুপায় হয়ে শিক্ষকরা খোলা বারান্দায় বা গাছের নিচে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করাতে বাধ্য হচ্ছেন। গত ১০ মে ২০২৬ তারিখে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট শিক্ষা অফিসকে বারবার লিখিত ও মৌখিকভাবে অবহিত করলেও ভবনটি সংস্কারে এখন পর্যন্ত মেলেনি কোনো কার্যকর সমাধান।


বর্ষা মৌসুমে বাড়ছে আতঙ্ক, কমছে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি

বিদ্যালয়ের এই জরাজীর্ণ দশা শুধু পাঠদানকেই ব্যাহত করছে না, বরং শিক্ষার্থীদের জীবনের জন্য এক বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভবনের বর্তমান পরিস্থিতি নিচে তুলে ধরা হলো:

  • পলেস্তারা ও ছাদ চুইয়ে পানি: ভবনটির পলেস্তারা খসে পড়ছে এবং সামান্য বৃষ্টি হলেই ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে আসবাবপত্র নষ্ট হচ্ছে।
  • বর্ষা মৌসুমের উদ্বেগ: বর্তমানে বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ায় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে চরম উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন অভিভাবকরা। অনেক অভিভাবক আতঙ্কে তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠানোই বন্ধ করে দিয়েছেন, যার ফলে স্কুলটিতে উপস্থিতির হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।
  • বিঘ্নিত পরিবেশ: শিক্ষকরা আক্ষেপ করে বলছেন, “বারান্দায় গাদাগাদি করে বসে ক্লাস নেওয়ায় পড়াশোনার সঠিক পরিবেশ সম্পূর্ণ বিঘ্নিত হচ্ছে এবং খোলা জায়গায় শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।”

জরাজীর্ণ এই ভবনটি দীর্ঘদিনের পুরনো হলেও রহস্যজনক কারণে এটিকে এখনও সরকারিভাবে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়নি। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জানান, সামান্য ঝড়-বৃষ্টি হলেও তারা চরম আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। বারান্দায় ক্লাস নেওয়ার ফলে বৃষ্টির ছাট সরাসরি শিক্ষার্থীদের গায়ে লাগে এবং বইপত্র ভিজে যায়। এমন প্রতিকূল পরিবেশে প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া অসম্ভব হলেও, সিলেবাস শেষ করার চাপে শিক্ষকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়েই কাজ করে যাচ্ছেন।


প্রশাসনের আশ্বাস ও সংস্কারের দীর্ঘসূত্রতায় চরম ভোগান্তি

স্থানীয় শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর (EED) এবং প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তাদের দাবি, তারা বিষয়টি সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত আছেন। নতুন ভবন নির্মাণের জন্য ইতিমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে এবং বাজেট বরাদ্দ পাওয়ার সাথে সাথেই কাজ শুরু হবে। তবে আমলাতান্ত্রিক চাকার এই ‘প্রক্রিয়াধীন’ দীর্ঘসূত্রতা কতদিন চলবে, তার কোনো সদুত্তর নেই কারো কাছে। যত দিন যাচ্ছে, ভবনের ফাটল ততই চওড়া হচ্ছে, যা যেকোনো বড় ধরণের দুর্ঘটনার আগাম সংকেত দিচ্ছে।

বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির (SMC) সদস্যরা অভিযোগ করেছেন যে, সঠিক তদারকি এবং জোরালো সদিচ্ছার অভাবে অনেক সময় পুরনো ভবনের সংস্কার কাজ আটকে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে জরুরি ভিত্তিতে সামান্য বরাদ্দ এলেও তা নামমাত্র জোড়াতালির মেরামতে ব্যয় করা হয়, যা স্থায়ী কোনো সমাধান দেয় না। এ ধরনের জরাজীর্ণ ভবনের তালিকা এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের জরুরি যোগাযোগ সংক্রান্ত তথ্য জানতে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (অফিসিয়াল ওয়েবসাইট) ভিজিট করতে পারেন।

এলাকাবাসীর জরুরি দাবি: বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার আগেই যেন প্রশাসন জরুরি ভিত্তিতে বিকল্প কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করে। যদি নতুন বহুতল ভবন তৈরিতে সময় লাগে, তবে মাঠের একপাশে অস্থায়ী কোনো টিনশেড ঘর তৈরি করে দ্রুত পাঠদান কার্যক্রম স্থানান্তর করা উচিত। শ্রেণিকক্ষের অভাবে শিক্ষার্থীদের যে অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে, তা কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে।


শিক্ষা অবকাঠামো উন্নয়ন ও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ

একটি দেশের টেকসই উন্নয়নের মূল ভিত্তি হলো শিক্ষা, আর সেই শিক্ষার প্রাথমিক স্তরই যদি এমন ঝুঁকিপূর্ণ ও ভঙ্গুর হয়, তবে তা সমগ্র জাতির জন্য উদ্বেগের বিষয়। মানসম্মত ও নিরাপদ অবকাঠামো নিশ্চিত করা ছাড়া কেবল নতুন কারিকুলাম দিয়ে শিক্ষার গুণগত পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। শ্রেণিকক্ষে ফাটল এবং বারান্দায় পাঠদান মূলত আমাদের স্থানীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকেই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। এই সমস্যা কেবল একটি স্কুলের নয়, বরং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেরই সাধারণ চিত্র।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেশজুড়ে জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ স্কুল ভবনগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত বিশেষ ক্রাশ প্রোগ্রাম বা সংস্কার প্রকল্প গ্রহণ করা উচিত। শিক্ষা বাজেটের একটি বড় অংশ অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় করা হলেও তার সঠিক ও স্বচ্ছ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা জরুরি।


সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)

প্রশ্ন ১: একটি স্কুল ভবনকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করার আইনি প্রক্রিয়া কী?

উত্তর: স্থানীয় শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (EED) প্রকৌশলীদের সরজমিন তদন্ত ও টেকনিক্যাল রিপোর্টের ভিত্তিতে উপজেলা বা জেলা কমিটি কোনো ঝুঁকিপূর্ণ ভবনকে ব্যবহারের অনুপযোগী বা পরিত্যক্ত ঘোষণা করতে পারে।

প্রশ্ন ২: ভবন জরাজীর্ণ হলে অস্থায়ী শেড নির্মাণের দায়িত্ব কার?

উত্তর: জরুরি পরিস্থিতিতে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি (SMC) স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, এলাকাবাসী এবং স্লিপ (SLIP) ফান্ডের সহায়তায় অস্থায়ী পাঠদানের ব্যবস্থা করতে পারে, যা পরবর্তীতে সরকারি বরাদ্দের সাথে সমন্বয় করা যায়।


উপসংহার ও শেষ কথা

শ্রেণিকক্ষে ফাটল ধরে বারান্দায় ক্লাস নেওয়া কেবল একটি সাধারণ খবর নয়, এটি আমাদের সামগ্রিক শিক্ষা অবকাঠামোর অবহেলার প্রতিচ্ছবি। বর্তমান ডিজিটাল ও স্মার্ট বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এমন ভঙ্গুর শিক্ষা অবকাঠামো সত্যিই বেমানান। শিক্ষার্থীদের জীবনের নিরাপত্তা অন্য যেকোনো বিষয়ের চেয়ে সবার আগে।

আমরা আশা করি, সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কোনো দুর্ঘটনার অপেক্ষা না করে দ্রুত এই বিদ্যালয়ের দিকে নজর দেবেন। ফাটল ধরা ভবনের জায়গায় দ্রুত গড়ে উঠবে একটি নিরাপদ, দৃষ্টিনন্দন ও আধুনিক বিদ্যাপীঠ, যেখানে শিশুরা নির্ভয়ে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হবে। অবহেলা যেন কোনোভাবেই একটি নিষ্পাপ শিশুর জীবনের ওপর কালো ছায়া না ফেলে, সেই কার্যকর পদক্ষেপই এখন সময়ের দাবি। প্রতিটি শিশুর জন্য একটি সুরক্ষিত শ্রেণিকক্ষ নিশ্চিত করা আমাদের সবার সম্মিলিত অঙ্গীকার হওয়া উচিত।

শিক্ষা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *