নাটোরের লালপুরে ১৫-১৭ ঘণ্টার ভয়াবহ লোডশেডিং: মাঝারি তাপপ্রবাহে এসএসসি পরীক্ষার্থীসহ জনজীবন বিপর্যস্ত
গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহে যখন মানুষ একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস খুঁজছেন, ঠিক সেই মুহূর্তে নাটোরের লালপুর উপজেলায় দৈনিক ১৫ থেকে ১৭ ঘণ্টার ভয়াবহ লোডশেডিং জনজীবনকে একেবারে অসহনীয় করে তুলেছে। এসএসসি পরীক্ষার্থী থেকে শুরু করে শিশু, বৃদ্ধ, ব্যবসায়ী, কৃষক ও খামারি—কেউই এই বিদ্যুৎ সংকটের চরম ভোগান্তি থেকে মুক্ত নন। একদিকে প্রচণ্ড তাপপ্রবাহ, অন্যদিকে বিদ্যুতের তীব্র অভাব—এই দুইয়ের মিলিত আঘাতে লালপুরবাসীর দৈনন্দিন জীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
তীব্র তাপপ্রবাহ ও শ্রেণিকক্ষে অসহনীয় পরিবেশ
ঈশ্বরদী আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে লালপুর উপজেলায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৬ থেকে ৩৮ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
- ভ্যাপসা গরম: কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. হেলাল উদ্দিন জানান, লালপুরে বর্তমানে মাঝারি তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকায় ভ্যাপসা গরম অনুভূত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি আরও কিছুদিন অব্যাহত থাকতে পারে।
- খোলা মাঠে ক্লাস: রক্তিম আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী শীতুল আক্তার মাহি জানায়, ফ্যান না চলায় গরমের মধ্যে হাতপাখা নিয়ে ক্লাস করতে হচ্ছে। পরিস্থিতি এতটাই কঠিন যে, বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক এ এইচ এম কামরুজ্জামান রাসেল অনেক সময় গাছের নিচে খোলা মাঠে ক্লাস নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
সবচেয়ে বেশি সংকটে এসএসসি পরীক্ষার্থীরা
দেশজুড়ে চলমান এসএসসি পরীক্ষার্থীদের জন্য এটি জীবনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। কিন্তু লালপুরের পরীক্ষার্থীরা বিদ্যুৎ সংকটের কারণে পড়াশোনার স্বাভাবিক সুযোগই পাচ্ছেন না।
বড়বাড়িয়া গ্রামের এসএসসি পরীক্ষার্থী তানিয়া খাতুন জানায়, দিন ও রাতের অধিকাংশ সময়ে বিদ্যুৎ না থাকায় প্রচণ্ড গরমে পড়তে বসা যাচ্ছে না, রাতে ঘুমও হচ্ছে না ঠিকমতো। পরীক্ষার এই চূড়ান্ত প্রস্তুতির সময়ে বিদ্যুৎ সংকট তার পুরো রুটিন ভেঙে দিয়েছে, যা সামগ্রিক ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
অর্থনৈতিক ক্ষতি ও স্বাস্থ্য ঝুঁকির চিত্র
লোডশেডিংয়ের নেতিবাচক প্রভাব কেবল শিক্ষার মাঝেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি স্থানীয় অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্যে বড় আঘাত হেনেছে।
| ক্ষতিগ্রস্ত খাত | ভুক্তভোগীদের বিবরণ ও ক্ষয়ক্ষতি |
| পোলট্রি খামার | উধনপাড়া গ্রামের খামারি মুক্তার হোসেন জানান, অতিরিক্ত গরমে বায়ু চলাচল বন্ধ থাকায় গত সাত দিনে তাঁর খামারের প্রায় ১০০টি মুরগি মারা গেছে। |
| পরিবহন ও শ্রমজীবী | ঢুষপাড়া গ্রামের ভ্যানচালক নুরুজ্জামান বিদ্যুৎ সংকটে ব্যাটারিচালিত ভ্যানে চার্জ দিতে না পেরে কার্যত কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। |
| জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা | উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ দিনে হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। অতিরিক্ত গরমে শিশুরা ডায়রিয়া-নিউমোনিয়ায় এবং বয়স্করা শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হচ্ছেন। |
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মুনজুর রহমান এবং আবাসিক চিকিৎসক ডা. সুরুজ্জামান শামীম জানান, লোডশেডিংয়ের কারণে একদিকে রোগী বাড়ছে, অন্যদিকে চিকিৎসাসেবা দিতেও চিকিৎসকদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।
বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহের বিশাল ব্যবধান
নাটোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২, লালপুর জোনাল অফিসের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মো. রেজাউল করিম জানান, লালপুর উপজেলায় প্রতিদিন গড়ে ২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা থাকলেও সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১০ থেকে ১৩ মেগাওয়াট, অর্থাৎ চাহিদার অর্ধেকেরও কম।
ফলে উপজেলার ৯টি ফিডারে পর্যায়ক্রমে দেড় ঘণ্টার লোডশেডিংয়ের পর মাত্র এক ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। জাতীয় পর্যায়ে জ্বালানি সংকটের কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে এবং কবে নাগাদ এর স্থায়ী সমাধান হবে তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
লালপুরের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি:
চাহিদা: █████████████████████████ 25 MW
সরবরাহ: ████████████ 12 MW (গড়ে)
সমাধান ও অতিরিক্ত বরাদ্দ: কিছুটা আশার আলো
এই ভয়াবহ পরিস্থিতি কিছুটা লাঘব করতে নাটোর-১ আসনের সংসদ সদস্য ও সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার ফারজানা শারমীন পুতুলের বিশেষ সুপারিশে গত শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) থেকে অতিরিক্ত ৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ডিজিএম রেজাউল করিম বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, এই অতিরিক্ত বরাদ্দ লালপুর ও বাগাতিপাড়া উপজেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে এই পরিমাণ বিদ্যুৎ মোট চাহিদার তুলনায় এখনো অনেক অপ্রতুল।
FAQ – সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী
প্রশ্ন ১: এসএসসি পরীক্ষা চলাকালীন পরীক্ষার্থীদের জন্য বিদ্যুতের বিশেষ কোনো জোনিং বা আলাদা ব্যবস্থা করা হচ্ছে কি?
উত্তর: পল্লী বিদ্যুৎ অফিস জানিয়েছে, ফিডারভিত্তিক সীমাবদ্ধতার কারণে আলাদা লাইন করা সম্ভব না হলেও প্রতিমন্ত্রীর সুপারিশে প্রাপ্ত অতিরিক্ত ৩ মেগাওয়াট বিদ্যুতের মাধ্যমে পরীক্ষার সময়ে লোডশেডিংয়ের মাত্রা কিছুটা কমানোর চেষ্টা চলছে।
প্রশ্ন ২: লালপুর জোনাল অফিসের লোডশেডিং ও বিদ্যুৎ সরবরাহের দৈনিক শিডিউল কোথায় পাওয়া যাবে?
উত্তর: নাটোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এর (অফিসিয়াল ওয়েবসাইট) অথবা লালপুর জোনাল অফিসের ফেসবুক পেজে দৈনিক ফিডারভিত্তিক লোডশেডিংয়ের সময়সূচী জানা যাবে।
উপসংহার ও শেষ কথা
লালপুরের এই পরিস্থিতি আসলে তীব্র গরমে বাংলাদেশের গ্রামীণ অঞ্চলের বিদ্যুৎ সংকটের এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি। শিক্ষার্থীরা যখন জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক পরীক্ষার মুখোমুখি, তখন এমন দীর্ঘ লোডশেডিং তাদের ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়।
স্থানীয়রা প্রতিমন্ত্রীর অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়ার উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও পরীক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করে দ্রুত সরবরাহ আরও বাড়ানোর জোরালো দাবি জানাচ্ছেন। দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের স্থায়ী সমাধান করা না গেলে প্রতি বছরই সাধারণ মানুষকে এই ধরণের অসহনীয় মানবিক সংকটের মুখোমুখি হতে হবে।

