সরকারি ভবনে প্রতিবন্ধীদের যাতায়াতে র‍্যাম্প স্থাপনের নির্দেশ কেন নয়: হাইকোর্টের রুল জারি, লাখ লাখ মানুষের মনে আশার সঞ্চার

দেশের সকল সরকারি, আধাসরকারী ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সহজে যাতায়াত ও প্রবেশাধিকারের জন্য বিশেষ র‍্যাম্প (Ramp) স্থাপনের নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। জনস্বার্থে দায়ের করা এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে মহামান্য আদালত এই আদেশ প্রদান করেন। এটি মূলত দেশের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনভাবে চলাফেরার অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিচার বিভাগের একটি অত্যন্ত যুগান্তকারী ও মানবিক পদক্ষেপ।

আদালত সংশ্লিষ্ট বিবাদী ও কর্তৃপক্ষকে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এই রুলের জবাব দিতে বলেছেন। রিট আবেদনকারীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, দেশের অধিকাংশ বহুতল সরকারি ভবনে আধুনিক লিফট থাকলেও নিচতলা থেকে লিফটে পৌঁছানোর জন্য বা মূল প্রবেশদ্বারের সিঁড়ি ব্যবহারের বিকল্প কোনো র‍্যাম্প নেই। এর ফলে হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী বা গুরুতর শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা যেকোনো জরুরি সরকারি সেবা নিতে গিয়ে প্রতিদিন চরম ভোগান্তি ও অপমানের শিকার হচ্ছেন।


প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভোগান্তি ও কাঠামোগত বৈষম্যের বাস্তব চিত্র

আমাদের দেশের অধিকাংশ সরকারি অফিস, আদালত ভবন, হাসপাতাল এমনকি অনেক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামো (Disabled-friendly Infrastructure) নেই। একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে যখন কোনো দাপ্তরিক কাজে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, উপজেলা পরিষদ কিংবা শিক্ষা অফিসে যেতে হয়, তখন ভবনের প্রবেশপথের খাড়া সিঁড়িই তার জন্য প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এই ধরণের কাঠামোগত বৈষম্য তাদের স্বাভাবিক নাগরিক জীবন ও অধিকারকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল ভবনের ভেতরে আধুনিক সুবিধা থাকলেই হবে না, ভবনের মূল প্রবেশপথ থেকেই প্রতিবন্ধীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

র‍্যাম্প নির্মাণের প্রধান কারিগরি শর্তসমূহ নিচে দেওয়া হলো:

  • উপযুক্ত ঢাল: র‍্যাম্পের ঢাল বা অ্যাঙ্গেল ($Angle$) এমন বৈজ্ঞানিক মাপে হতে হবে যেন একজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী অন্য কারো সাহায্য ছাড়াই নিজে নিজে তা ব্যবহার করতে পারেন।
  • অনুপযোগী নকশা বর্জন: বর্তমানে দেশের হাতেগোনা কিছু স্থানে নামমাত্র র‍্যাম্প থাকলেও সেগুলো অত্যন্ত খাড়া ও পিচ্ছিল হওয়ার কারণে সম্পূর্ণ ব্যবহারের অনুপযোগী।
  • সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ: নতুন ভবনগুলোতে শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী র‍্যাম্প রাখা বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং পুরাতন ভবনগুলোতে দ্রুত সংস্কারের মাধ্যমে এই সুবিধা যুক্ত করতে হবে।

হাইকোর্টের এই রুল জারির ফলে এখন থেকে দেশের সরকারি ভবন নির্মাণের মূল নকশা বা ডিজাইনেও (Design) বড় ধরণের ইতিবাচক পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এটি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের পথে বড় ধরণের অগ্রগতি।


আইনি বাধ্যবাধকতা ও সুগম প্রবেশগম্যতার সংকট

মানবাধিকার কর্মী ও আইনজ্ঞদের মতে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার রক্ষা করা কোনো দয়া, করুণা বা অনুকম্পা নয়, বরং এটি তাদের সম্পূর্ণ সাংবিধানিক ও আইনি অধিকার। দেশে প্রচলিত ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও সুরক্ষা আইন-২০১৩’ অনুযায়ী সকল পাবলিক প্লেস বা সরকারি-বেসরকারি জনসমাবেশস্থলে তাদের সুগম প্রবেশগম্যতা (Accessibility) নিশ্চিত করা রাষ্ট্রীয়ভাবে বাধ্যতামূলক।

হাইকোর্টের এই রুল মূলত সেই আইনের যথাযথ ও কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার একটি জোরালো তাগিদ। এটি কেবল প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্যই উপকার বয়ে আনবে না, বরং দেশের প্রবীণ, বয়স্ক ও অসুস্থ সাধারণ নাগরিকদের যাতায়াতকেও অনেক সহজতর করবে। এ সংক্রান্ত হাইকোর্টের রিটের পূর্ণাঙ্গ আদেশ ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা দেখতে মন্ত্রণালয়ের (অফিসিয়াল ওয়েবসাইট) ভিজিট করতে পারেন।


অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ও স্মার্ট বাংলাদেশের রূপরেখা

বর্তমান সরকার ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার যে দৃঢ় অঙ্গীকার করেছে, তার মূল ভিত্তিই হলো সমাজের সকল স্তরের মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করা। প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীকে পেছনে ফেলে কোনো জাতীয় উন্নয়নই কখনো টেকসই হতে পারে না।

দপ্তরের নামসম্ভাব্য দায়িত্ব ও ভূমিকা
গণপূর্ত অধিদপ্তর (PWD)নতুন ও পুরাতন সরকারি ভবনে আন্তর্জাতিক মানের র‍্যাম্পের নকশা ও নির্মাণ
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়প্রতিবন্ধীদের অধিকার সুরক্ষায় প্রতিটি দপ্তরে পৃথক সার্ভিস ডেস্ক নিশ্চিতকরণ
স্থানীয় প্রশাসনজেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সকল পাবলিক বিল্ডিং তদারকি

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে প্রতিটি পাবলিক বিল্ডিং এবং গণপরিবহনে প্রতিবন্ধীবান্ধব বিশেষ ব্যবস্থা রাখা আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশেও এই সংস্কৃতির চর্চা ও প্রয়োগ শুরু করা এখন সময়ের দাবি। র‍্যাম্প স্থাপনের মাধ্যমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সরকারি কর্মসংস্থান এবং সামাজিক অংশগ্রহণের পথ আরও প্রশস্ত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


FAQ – সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী

প্রশ্ন ১: হাইকোর্টের এই রুলের জবাব দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কতদিন সময় দেওয়া হয়েছে?

উত্তর: মহামান্য হাইকোর্ট রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে বিবাদীদের আগামী (নির্ধারিত তারিখ) বা (বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী) কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এই রুলের সন্তোষজনক জবাব দাখিল করার নির্দেশ দিয়েছেন।

প্রশ্ন ২: এই নির্দেশনা কি বেসরকারি ভবন বা শপিং মলগুলোর জন্যও প্রযোজ্য হবে?

উত্তর: বর্তমান রিটটি মূলত সরকারি, আধাসরকারী ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের ভবনের ওপর করা হয়েছে। তবে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী সকল বেসরকারি পাবলিক বিল্ডিংয়েও এই সুবিধা রাখা বাধ্যতামূলক, যা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়িত হওয়া প্রয়োজন।


উপসংহার ও শেষ কথা

সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সকল দপ্তরে র‍্যাম্প স্থাপনের বিষয়ে হাইকোর্টের এই ঐতিহাসিক রুল দেশের লাখ লাখ প্রতিবন্ধী মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। আমরা গভীরভাবে আশা করি, সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর কোনো ধরণের কালক্ষেপণ না করে দ্রুত আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেবে। প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলা কেবল আইনের বাধ্যবাধকতার খাতিরে নয়, বরং মানবিক দিক থেকেও আমাদের সবার জন্য অপরিহার্য। আসুন, আমরা সবাই মিলে আমাদের চারপাশের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতিবন্ধীবান্ধব করতে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতনতা তৈরি করি। একটি বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তোলাই হোক আমাদের মূল লক্ষ্য, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার ও মর্যাদা সুনিশ্চিত হবে।

শিক্ষা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *