৩ শিক্ষার্থীর জন্য ৮ শিক্ষক! শিক্ষা প্রশাসনের চরম অব্যবস্থাপনা ও জনবল বন্টনে অসমতার চিত্র
দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় তীব্র শিক্ষক সংকটের খবর প্রায়ই সংবাদপত্রের শিরোনাম হলেও এবার দেখা গেছে ঠিক তার উল্টো ও এক অবিশ্বাস্য চিত্র। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাত্র ৩ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে ৮ জন শিক্ষক নিয়োজিত থাকার তথ্য সামনে এসেছে। যেখানে দেশের সিংহভাগ বিদ্যালয়ে শত শত শিক্ষার্থীর বিপরীতে মাত্র ২-৩ জন শিক্ষক পাঠদান চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন, সেখানে এমন জনবল বিন্যাসকে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় এবং চরম প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিক্ষার্থী শূন্য ক্যাম্পাস, অথচ বহাল তবিয়তে ৮ শিক্ষক
সংশ্লিষ্ট এলাকার শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, ওই বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বিগত কয়েক বছর ধরেই ক্রমাগত কমছে। বর্তমান পরিস্থিতির মূল চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:
- নামমাত্র উপস্থিতি: বর্তমানে কাগজে-কলমে কয়েকজনের নাম থাকলেও নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত হয় মাত্র ৩ জন শিক্ষার্থী।
- নিয়মিত বেতন-ভাতা: ৩ জন শিক্ষার্থী থাকলেও প্রতিষ্ঠানটিতে প্রধান শিক্ষকসহ ৮ জন এমপিওভুক্ত (MPO) শিক্ষক-কর্মচারী নিয়মিত প্রতি মাসে সরকারের বিপুল পরিমাণ বেতন-ভাতা তুলছেন।
- তদারকির অভাব: স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং মাঠ পর্যায়ের শিক্ষা কর্মকর্তাদের তদারকি ও জবাবদিহিতার চরম অভাবের বহিঃপ্রকাশ।
কোনো প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী না থাকার পরেও কেন সেখানে এত বিপুল সংখ্যক শিক্ষককে বছরের পর বছর বসিয়ে রাখা হয়েছে, তা নিয়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়রা এই শিক্ষকদের অনতিবিলম্বে দ্রুত অন্য কোনো শিক্ষক-সংকটে থাকা স্কুলে বদলি বা সমন্বয় করার জোর দাবি জানিয়েছেন।
শিক্ষক সংকট বনাম উদ্বৃত্ত শিক্ষক: নীতিমালার প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন
সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জনবল কাঠামোর সুনির্দিষ্ট নীতিমালা (Teacher-Student Ratio) থাকলেও এই ক্ষেত্রে তার কোনো বাস্তব প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
এই অসম বন্টনের ফলে সৃষ্ট সংকটসমূহ:
১. অলস সময় পার ও মেধার অপচয়
নীতি অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সংখ্যক শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষকের পদ বরাদ্দ থাকার কথা। কিন্তু এই বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর চেয়ে শিক্ষকের সংখ্যা আড়াই গুণ বেশি হওয়ায় অনেক শিক্ষক এই সুযোগে কোনো ক্লাস না করেই অলস সময় পার করছেন। তাদের মেধা ও শ্রমকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে না পারাটা শিক্ষার লক্ষ্য অর্জনে বড় বাধা।
২. পাশের স্কুলেই তীব্র বৈষম্য
একই উপজেলার বা পাশের ইউনিয়নের অন্য স্কুলগুলোতে দেখা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন ও করুণ চিত্র। সেখানে কয়েক শ শিক্ষার্থীর বিপরীতে রয়েছেন মাত্র ৩-৪ জন শিক্ষক। এই অসম বন্টন শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক ভারসাম্য ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের শিক্ষার অধিকার নষ্ট করছে।
৩. প্রশাসনের আশ্বাসের গ্যাঁড়াকল
ইতিমধ্যে স্থানীয় শিক্ষা বিভাগ এই বিষয়টি গুরুত্বের সাথে নিয়েছে বলে জানা গেছে। ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর প্রকৃত অনুপাত পরীক্ষা করে একটি বিশেষ প্রতিবেদন তৈরি করা হচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে, যৌক্তিক কারণ ছাড়াই যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত শিক্ষক অলস বসে থাকে, তবে তাদের ‘প্রশাসনিক প্রয়োজনে’ দ্রুত পদায়ন করা হবে। এ সংক্রান্ত বদলি ও সমন্বয়ের আইনি নীতিমালা দেখতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের (অফিসিয়াল ওয়েবসাইট) ভিজিট করতে পারেন।
শিক্ষার ভারসাম্য রক্ষায় ‘র্যাশনালিজেশন’-এর দাবি
এই ধরণের অদ্ভুত ও অসংগতিপূর্ণ চিত্র দূর করতে শিক্ষা ব্যবস্থার অনলাইন ডাটাবেজ বা ডিজিটাল মনিটরিং আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন বলে মনে করেন শিক্ষাবিদরা। প্রতি বছর শিক্ষার্থী ভর্তির হার অনুযায়ী শিক্ষকদের স্বয়ংক্রিয় বদলি বা পদায়নের ব্যবস্থা থাকলে এমন সমস্যা তৈরি হতো না।
স্কুল একীভূতকরণের (Merge) প্রস্তাব: বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষার মানোন্নয়নে ‘র্যাশনালিজেশন’ বা যৌক্তিক জনবল বিন্যাস অত্যন্ত জরুরি। কোনো স্কুলে শিক্ষার্থী না থাকলে সময় নষ্ট না করে সেই স্কুলটি অন্য কোনো পার্শ্ববর্তী স্কুলের সাথে একীভূত বা মার্জ (Merge) করা উচিত। এতে করে যেমন সরকারি অর্থের সাশ্রয় হবে, তেমনি শিক্ষকদের শ্রমের সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
প্রশ্ন ১: সরকারি বা এমপিওভুক্ত নিয়মানুযায়ী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর আদর্শ অনুপাত কত হওয়া উচিত?
উত্তর: জাতীয় শিক্ষানীতি ও জনবল কাঠামো অনুযায়ী, মাধ্যমিক স্তরে সাধারণত ৩০-৩৫ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে ১ জন শিক্ষক (১:৩৫) থাকার কথা বলা হয়েছে। তবে প্রত্যন্ত অঞ্চলে এই অনুপাত কিছুটা শিথিল হতে পারে, কিন্তু ৩ জনের জন্য ৮ শিক্ষক কোনো নীতিমালাই সমর্থন করে না।
প্রশ্ন ২: শিক্ষার্থী সংকটে থাকা স্কুল অন্য স্কুলের সাথে একীভূত হলে শিক্ষকদের চাকরি কি থাকবে?
উত্তর: হ্যাঁ, সরকারি বা এমপিওভুক্ত নীতিমালার অধীনে কোনো স্কুল একীভূত হলে কর্মরত শিক্ষকদের চাকরি সচল থাকে এবং তাদের অন্য কোনো শূন্য পদের বিপরীতে বা নিকটবর্তী বিদ্যালয়ে প্রশাসনিক আদেশে বদলি করা হয়।
উপসংহার ও শেষ কথা
৩ শিক্ষার্থীর জন্য ৮ শিক্ষক থাকার এই বিলাসিতা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এই ঘটনাটি আমাদের শিক্ষা প্রশাসনের জন্য একটি বড় ও লজ্জাজনক শিক্ষা। এটি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মাঠ পর্যায়ের তদারকির দুর্বলতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে এই অসংগতি দূর করা না হলে এটি অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের জন্য একটি খারাপ উদাহরণ হয়ে থাকবে। আমরা আশা করি, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর দ্রুত আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষার এই ভারসাম্যহীনতা দূর করবে। মেধাবী ও দক্ষ শিক্ষক জনবলকে সঠিকভাবে বন্টন করে প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য সমান শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করাই হোক মূল লক্ষ্য।

