সিঁড়ি ছাড়াই দুই তলা স্কুল ভবন নির্মাণ ও চরম গাফিলতি: পুরো ভবনটিই এখন পরিত্যক্ত, ঝুঁকিতে শিক্ষার্থীরা
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (EED) মাঠ পর্যায়ের তদারকির অভাব এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চরম খামখেয়ালির এক নজিরবিহীন ও চাঞ্চল্যকর চিত্র সামনে এসেছে। দেশের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সিঁড়ি ছাড়াই দুই তলা স্কুল ভবন নির্মাণ করার মতো অদ্ভুত ও দায়িত্বজ্ঞানহীন ঘটনা ঘটেছে। শুধু তাই নয়, মাত্র কয়েক বছর আগে তৈরি করা এই পুরো ভবনটিই এখন পরিত্যক্ত ও জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। স্থানীয় শিক্ষা অফিস এবং উপজেলা প্রশাসনের অবহেলার কারণে সরকারের লাখ লাখ টাকা অপচয় হয়েছে। বর্তমানে এই জরাজীর্ণ কাঠামোর কারণে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও নিরাপত্তা চরম ঝুঁকিতে পড়েছে। এই চাঞ্চল্যকর অনিয়মের ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনার বিবরণ ও সিঁড়িবিহীন ভবনের বর্তমান পরিস্থিতি
স্থানীয় বাসিন্দা ও বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বেশ কয়েক বছর আগে বিদ্যালয়টিতে একটি নতুন বহুতল ভবন অনুমোদিত হয়। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তড়িঘড়ি করে মূল ভবনের কাঠামো দাঁড় করালেও ছাদ ও দ্বিতীয় তলায় ওঠার জন্য কোনো সিঁড়ি তৈরি করেনি। সিঁড়ি ছাড়াই দুই তলা স্কুল ভবন নির্মাণ কাজ শেষ করে তারা বিল তুলে নিয়ে চলে যায় বলে অভিযোগ উঠেছে।
পরবর্তীতে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দোতলায় ওঠার জন্য একটি অস্থায়ী কাঠের মই ব্যবহার করলেও তা ভেঙে গিয়ে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী মারাত্মক আহত হয়। বর্তমানে ভবনটির দেয়ালের প্লাস্টার খসে পড়ছে এবং ছাদের রড বেরিয়ে এসেছে। পুরো ভবনটিই এখন পরিত্যক্ত (Entire building in disrepair) অবস্থায় রয়েছে। বাধ্য হয়ে শিক্ষকরা খোলা আকাশের নিচে এবং একটি ভাঙা টিনশেড ঘরে শিক্ষার্থীদের ক্লাস নিচ্ছেন, যা বর্ষাকালে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
প্রশাসনিক তদন্ত ও সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ তারিখসমূহ
এই অবাস্তব ও অনৈতিক ঘটনার খবর সংবাদমাধ্যমে আসার পর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস ও উপজেলা প্রকৌশল বিভাগ নড়েচড়ে বসেছে। এই সংক্রান্ত তদন্ত ও সম্ভাব্য সংস্কার কার্যক্রমের সময়সূচি নিচে দেওয়া হলো:
- জরুরি তদন্ত কমিটি গঠন: ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে আজ ৩ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
- সরেজমিনে পরিদর্শনের তারিখ: আগামী (নির্ধারিত তারিখ) তদন্ত কমিটির কারিগরি বিশেষজ্ঞরা বিদ্যালয়টি সরাসরি পরিদর্শন করবেন।
- তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের শেষ সময়: (বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী) আগামী ৭ কার্যদিবসের মধ্যে এই অনিয়মের মূল হোতাদের চিহ্নিত করে প্রতিবেদন জমা দিতে হবে।
- নতুন নকশা ও সিঁড়ি নির্মাণ শুরু: তদন্তের সুপারিশের ভিত্তিতে আগামী (নির্ধারিত তারিখ)-এর মধ্যে ভবনের নতুন নকশা অনুমোদন করে নির্মাণ কাজ শুরু হতে পারে।
বিকল্প উপায়ে শ্রেণী কার্যক্রম চালু ও শিক্ষার্থীদের সুরক্ষার পদ্ধতি
পরিত্যক্ত ভবনটি ভেঙে পড়া বা নতুন করে কোনো দুর্ঘটনা এড়াতে এবং পড়াশোনা সচল রাখতে শিক্ষা অফিস নিচের পদক্ষেপগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করছে:
- ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ঘোষণা: লাল ফিতা দিয়ে পুরো ভবনটিই এখন পরিত্যক্ত ও বিপজ্জনক এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করে শিক্ষার্থীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
- অস্থায়ী প্যান্ডেল বা শেড নির্মাণ: জরুরী ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা সচল রাখতে বিদ্যালয়ের মাঠে একটি বড় টিনের শেড তৈরি করা হবে।
- ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্তকরণ: সিঁড়ি ছাড়াই দুই তলা স্কুল ভবন নির্মাণ-এর সাথে জড়িত মূল ঠিকাদারি সংস্থাকে (Contractor Firm) কালো তালিকাভুক্ত করার আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
- নিয়মিত অগ্রগতি তদারকি: নতুন করে ভবনটি সংস্কার বা সিঁড়ি তৈরির কাজ শুরু হলে উপজেলা উপ-সহকারী প্রকৌশলী প্রতি সপ্তাহে কাজের মান তদারকি করবেন।
শিক্ষা অফিসে অভিযোগ দায়েরের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
ভবিষ্যতে দেশের যেকোনো এলাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণে এমন জালিয়াতি বা রডের বদলে বাঁশ ব্যবহারের মতো ঘটনা দেখলে সচেতন নাগরিকরা নিচে উল্লেখিত নথিপত্রসহ শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে লিখিত অভিযোগ জানাতে পারেন:
- লিখিত অভিযোগপত্র: ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ, স্কুলের নাম ও ঠিকাদারের নাম উল্লেখ করে এলাকাবাসীর যৌথ সই করা আবেদনপত্র।
- ছবি ও ভিডিও ফুটেজ: সিঁড়ি ছাড়া ভবনের স্পষ্ট ছবি এবং জরাজীর্ণ প্লাস্টার ও রড বেরিয়ে থাকার ভিডিও।
- বরাদ্দের অনুলিপি: তথ্য অধিকার আইনের (RTI) আওতায় সংগৃহীত মেগা প্রজেক্টটির মূল বাজেট ও ওয়ার্ক অর্ডারের (Work Order) কপি।
প্রজেক্টের বাজেট ও সরকারের আর্থিক তথ্যের বিবরণ
এই ভবন নির্মাণ প্রকল্পে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ব্যয় হলেও তা সাধারণ শিক্ষার্থীদের কোনো কাজেই আসেনি।
- মূল ভবনের বাজেট: এই দুই তলা ভবনটি নির্মাণের জন্য প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে (বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী) বড় অঙ্কের টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।
- সংস্কারের অতিরিক্ত ফান্ড: নতুন করে সিঁড়ি তৈরি এবং জরাজীর্ণ ভবনটি সংস্কার করার জন্য সরকারের কাছ থেকে বিশেষ আপদকালীন তহবিল (বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী) চাওয়া হয়েছে।
- অভিযোগ প্রক্রিয়ার ফি: সরকারি শিক্ষা অফিসে বা অনলাইন পোর্টালে এই ধরণের দুর্নীতি বা অনিয়মের তথ্য দেওয়ার জন্য কোনো ফি লাগবে না। এটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করা যাবে।
শিক্ষা অধিদপ্তর ও সরকারের কঠোর নির্দেশনা বা সতর্কতা
এই নজিরবিহীন জালিয়াতির ঘটনা সামনে আসার পর প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এবং শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর (EED) দেশের সকল জেলা প্রকৌশলীদের জন্য কড়া সতর্কবার্তা জারি করেছে।
বিশেষ সতর্কবার্তা: দেশের যেকোনো প্রান্তে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণের নকশায় সামান্যতম পরিবর্তন বা গাফিলতি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী এবং ঠিকাদার উভয়ের বিরুদ্ধেই ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হবে। কোনো নকশাবহির্ভূত ভবন পরিদর্শনের আগে বিল পাস করা যাবে না।
- ভবন সুরক্ষায় প্রধান শিক্ষকদের দায়িত্ব: কোনো ঠিকাদার কাজ অসম্পূর্ণ রেখে চলে যেতে চাইলে প্রধান শিক্ষককে তাৎক্ষণিকভাবে জেলা শিক্ষা অফিসকে লিখিতভাবে জানাতে হবে।
- নিরাপত্তা অডিট: দেশের সকল পুরনো ও নতুন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবনের স্থায়িত্ব পরীক্ষা করতে খুব শীঘ্রই একটি বিশেষ ‘সেফটি অডিট’ (Safety Audit) শুরু হবে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
প্রশ্ন ১: সিঁড়ি ছাড়াই দুই তলা স্কুল ভবন নির্মাণ করার সময় স্থানীয় প্রকৌশলীরা কেন কোনো ব্যবস্থা নেননি?
উত্তর: প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, মাঠ পর্যায়ের প্রকৌশলী ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাঝে যোগসাজশ ছিল। তারা সরেজমিনে পরিদর্শন না করেই ভুয়া রিপোর্টের মাধ্যমে চূড়ান্ত বিল পাস করে নিয়েছেন, যা একটি গুরুতর অপরাধ।
প্রশ্ন ২: পুরো ভবনটিই এখন পরিত্যক্ত হওয়ায় শিক্ষার্থীদের ক্লাস কীভাবে নেওয়া হচ্ছে?
উত্তর: বর্তমানে ভবনটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় বাধ্য হয়ে শিক্ষকরা গাছের নিচে এবং পাশের একটি কাঁচা বারান্দায় শিক্ষার্থীদের ক্লাস নিচ্ছেন। বর্ষাকালে বা অতিরিক্ত গরমে স্কুল সাময়িকভাবে বন্ধ (বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী) রাখতে হচ্ছে।
উপসংহার
আমাদের কোমলমতি শিশুদের নিরাপদ শিক্ষাঙ্গন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। সিঁড়ি ছাড়াই দুই তলা স্কুল ভবন নির্মাণ করার মতো অদ্ভুত অনিয়ম এবং পুরো ভবনটিই এখন পরিত্যক্ত থাকার ঘটনা দেশের শিক্ষা অবকাঠামোর তদারকি ব্যবস্থার বড় দুর্বলতাকেই ফুটিয়ে তোলে। আমরা আশা করি, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশন (ACC) দ্রুত এই ঘটনার সাথে জড়িত অসাধু কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেবে। এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার তদন্তের সর্বশেষ আপডেট, নতুন ভবনের বাজেট এবং শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের জরুরি বিজ্ঞপ্তি সরাসরি পড়তে অধিদপ্তরের অফিশিয়াল (অফিসিয়াল ওয়েবসাইট)-এ নিয়মিত চোখ রাখুন।

